আফ্রিকার কঙ্গোর গভীর অরণ্যে এক নতুন প্রজাতির বানরের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় দুই দশক ধরে চলা গবেষণার পর এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। ছোট আকৃতির বানরটির মুখমণ্ডল উজ্জ্বল কমলা বর্ণের এবং এটি মূলত কঙ্গোর লোমামি জাতীয় উদ্যান অঞ্চলে বসবাস করে। স্থানীয় আদিবাসীরা একে 'লিকওয়েলি' নামে চেনে। বৈজ্ঞানিক মহলে এর নামকরণ করা হয়েছে কোলোবাস কঙ্গোএনসিস (Colobus congoensis) হিসেবে। এটি কোলোবাস গোত্রের ষষ্ঠ প্রজাতি, যাদের সবাই আফ্রিকা মহাদেশে দেখা যায়।

এই আবিষ্কারের সূত্রপাত ২০০৮ সালে, যখন একটি অস্পষ্ট আলোকচিত্রে অচেনা এক বানর ধরা পড়ে। গবেষকেরা তখনই কৌতূহলী হয়ে ওঠেন এবং এর খোঁজে নেমে পড়েন। দীর্ঘ ১৮ বছর পর অবশেষে তাঁরা সফল হন। প্রথমবার দেখার প্রায় এক দশক পর আবারও বানরটির দেখা মেলে, যা নতুন করে গবেষণার পথ খুলে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জুলিয়া অ্যারেনসনের মতে, বানরটির দৈহিক গঠন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এটি প্রকৃতপক্ষে একেবারে নতুন একটি প্রজাতি, যা আগে কখনো নথিভুক্ত হয়নি।

গবেষক টেরেসি হার্ট জানান, লোমামি বনে টানা এক দশক ধরে অনুসন্ধানের পর তারা বানরটির স্পষ্ট ছবি তুলতে সক্ষম হন। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ব্যাপক জরিপ চালানো হয়। এ সময় বিজ্ঞানীরা বানরটির ব্যাঙের মতো অদ্ভুত ডাক রেকর্ড করেন এবং পরীক্ষাগারে ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। বানরটির আবাসস্থলের আশপাশের ৫২টি গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গেও তারা আলোচনা করেন। মজার ব্যাপার হলো, এসব গ্রামের মধ্যে মাত্র আটটি গ্রামের মানুষ এ বানরকে চিনতে পেরেছিলেন, যা এর দুর্লভতার প্রমাণ দেয়। প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার বনের মধ্যে বিজ্ঞানীরা ১১৪ বার বানরটিকে দেখতে পেলেও একে ধরা ছিল বেশ কঠিন।

গবেষণা দলের প্রধান জন হার্ট এই সাফল্যের কৃতিত্ব কঙ্গোর স্থানীয় অভিযাত্রী বিজ্ঞানীদের দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁদের সাহসিকতা ও অধ্যবসায় না থাকলে লিকওয়েলির অস্তিত্ব হয়তো চিরকাল অজানা থেকে যেত। বিজ্ঞান সাময়িকী 'পিএলওএস ওয়ান'-এ এই আবিষ্কারের বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। এর ফলে লিকওয়েলি গত ৭৫ বছরের মধ্যে আফ্রিকার পঞ্চম বানর প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেল, যা আগে বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।

গবেষকেরা ধারণা করছেন, বানরটি কঙ্গো নদীর তিনটি শাখানদীর মাঝখানের একটি ছোট্ট বন এলাকায় বাস করে। তবে বন্য প্রাণী শিকার ও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে এটি বর্তমানে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই বিজ্ঞানীদের দলটি এ বানরকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে ঘোষণার সুপারিশ করেছে। গবেষকেরা আশা করছেন, এই আবিষ্কার কঙ্গোর লোমামি জাতীয় উদ্যান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সেখানে লুকিয়ে থাকা আরও অজানা প্রাণীর সন্ধান ও সংরক্ষণ সহজ হবে।