সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কামিশলি শহরের অদূরে ধুলোমাটির ধূসরতার মাঝে যেন এক উজ্জ্বল রঙের আভা ছড়াচ্ছে জিনওয়ার গ্রাম। প্রায় ৩০টি মাটির ঘর, বাগান, ফুল, শাকসবজি ও ফলের গাছে ঘেরা এই জনপদের প্রবেশপথে কাঁধে রাইফেল ও হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে পাহারায় দাঁড়িয়ে থাকেন এক নারী, যিনি একাধারে একজন মা-ও। কুর্দি শব্দ ‘জিন’ (নারী) ও ‘ওয়ার’ (স্থান বা ভূমি)-এর সমন্বয়ে গড়া এই নামের অর্থই হলো ‘নারীস্থান’। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই গ্রামটি কুর্দি, আরব ও ইয়াজিদি নারীদের জন্য এক অনন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে।

ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বর্বরতার শিকার, স্বামীকে হারানো অথবা বৈবাহিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে মরিয়া নারীরা স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও টিকে থাকার সংগ্রামে এখানে একত্র হয়েছেন। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা, বৈষম্য ও নানাবিধ প্রতিকূলতার প্রেক্ষাপটেই এই নারী-অধ্যুষিত জনপদের গোড়াপত্তন হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ২৫ জন নারী বসবাস করেন। সঙ্গে রয়েছেন তাঁদের সন্তানেরা এবং গরু, ভেড়া, মুরগি ও ময়ূরসহ বিভিন্ন পশুপাখি। নারীরা নিজেরাই মাটি, পানি ও খড়ের ইট বানিয়ে ঘর তুলেছেন, গড়েছেন নিজেদের পাঠশালা। দৈনন্দিন খাদ্যের চাহিদা মেটে তাঁদের উৎপাদিত বেগুন, টমেটো, মরিচ, শসা, পেঁয়াজ ও রসুনে।

এই নারী-নেতৃত্বাধীন বসতিতে পুরুষদের প্রবেশ কেবল পরিদর্শক হিসেবে অনুমোদিত; স্থায়ীভাবে বসবাস করা বা রাত কাটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আলোকচিত্র শিল্পী মাত্তেও ত্রেভিসান উত্তর-পূর্ব সিরিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নারী-নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর বিস্তৃত কাজ করতে গিয়ে জিনওয়ারের জীবনচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেইসঙ্গে তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রাম জারুদির নারীদের জীবন এবং কামিশলির নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা কমিটির তৎপরতাও নথিবদ্ধ করেছেন।

স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর প্রায় এক বছর আগে আশ্রয়ের খোঁজে জিনওয়ারে আসেন ৫৫ বছর বয়সী ওয়েলাত। আগের জীবনকে ‘কোনোমতে বেঁচে থাকা’ বলে বর্ণনা করে তিনি জানান, এই গ্রামের কথা শোনার পরই তিনি এখানে চলে আসেন। ওয়েলাত বলেন, ‘এখানে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, আমার প্রকৃত সত্তাকে।’ প্রতিদিন সকালে কুর্দি ভাষার ক্লাস শেষে তিনি গ্রামের প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্ব নেন। এখানকার বাসিন্দারা গ্রাম পরিচালনার বিভিন্ন কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত দর্শনার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও সামাজিক আদান-প্রদানেও যুক্ত হন। ওয়েলাতের ভাষায়, সংহতি আর পারস্পরিক সহযোগিতাই এই জনপদের মূলমন্ত্র। তিনি বলেন, ‘মায়েরা এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ বেশ ভালো এবং সবার মনোবল খুব দৃঢ়।’ সিরিয়ার অন্য কোথাও এমন শান্তি ও নিরাপত্তা না পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বামীর মৃত্যুর সাড়ে চার বছর পর ৫৭ বছর বয়সী নুজিন মিহেমেদ এখানে আসেন বন্ধুদের উৎসাহে। আল-দিরবাসিয়ার কাছের এক গ্রামে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন ও অসুস্থতার কষ্ট ভোগ করা মিহেমেদ বলেন, ‘আমাদের সমাজে কোনো দয়ামায়া নেই। এমনকি আমার নিজের ভাইবোনেরাও আমার ওপর অত্যাচার করেছে।’ বর্তমানে তিনি রুটি তৈরি থেকে পাহারা পর্যন্ত সব কাজই করেন। ‘আমরা প্রত্যেকে আলাদা, কিন্তু সবাই একটি পরিবারের মতো। যে কাজই হোক, আমরা একসঙ্গে করি,’ যোগ করেন তিনি। জিনওয়ারের জীবন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো বলে উল্লেখ করে মিহেমেদ জানান, তিনি এই গ্রামকে ভালোবেসে ফেলেছেন।

পাঁচ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতিকালে জিনওয়ারের খোঁজ পান ২৮ বছর বয়সী জেসমিন। তিনি বলেন, ‘জার্মানিতে প্রায় চলেই গিয়েছিলাম। তখনই এই গ্রামের কথা জানতে পেরে সবকিছু বদলে যায়।’ বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের নারীদের একত্রে অবস্থান করা এই গ্রামকে তিনি বিশ্বের জন্য বিপ্লব ও শান্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন। জেসমিন জানান, অন্য কোনো শহরে নিজেকে কল্পনা করাই এখন কঠিন। তবে তাঁর আকাঙ্ক্ষা শুধু গ্রামের সীমানায় আটকে নেই; রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বে নারীদের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণই তাঁর প্রত্যাশা।

জিনওয়ারের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার জারুদি গ্রামও তৃণমূলের সামষ্টিক কাঠামো ও সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নারী-পুরুষ উভয়েই সেখানে কৃষি ও স্থানীয় সেবার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেন। যুদ্ধ ও সীমিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এই জনপদে নারীরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ভূমিকা রাখছেন। ২০১৩ সালের ধ্বংসযজ্ঞের পর বাসিন্দারা গ্রামের কেন্দ্রে একটি গণবাগান তৈরি করেন, যা এখন জনজীবনের প্রাণকেন্দ্র এবং উৎপাদিত ফসলের লভ্যাংশ সকলে ভাগ করে নেন। গ্রামের সহপ্রধান নেহরিমান বাড়ির বাগান পারিবারিকভাবে ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, কোবানি শহরের নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এক বছর আগে জারুদিতে আসা ২৮ বছর বয়সী নেসরিন বোজা এখন গ্রাম পরিষদের সদস্য। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ও কাজ তাঁর রাগ কমিয়ে সহযোগিতাপরায়ণ করে তুলেছে বলে জানান তিনি।

কামিশলির ‘এইচপিসি-জিন’ নামের নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা কমিটি বেসামরিক সুরক্ষা, জনসমাগমস্থল পর্যবেক্ষণ এবং সংঘাতকালে সামাজিক সংহতি বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করে। কমিটির সদস্য মিহেম্মেদ ইসমাইল স্মরণসভা ও শেষকৃত্য পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে বলেন, ‘একজন মা হিসেবে আমি যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।’ ২০১৩ সালে মাঠে কাজ করা অপর সদস্য নিসমিয়ে ইমসেদিন ২০২৩ সালে আত্মরক্ষাকে নারীদের জন্য অপরিহার্য মনে করে এই কমিটিতে যোগ দেন। আরেক সদস্য ওয়াদেন হুসেন সেখমুস ১৯৮৭ সাল থেকে কুর্দি আন্দোলনে যুক্ত এবং দীর্ঘ ৪০ বছর গেরিলাদের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছেন। শহীদ ভাই ও প্রয়াত স্বামীর কথা স্মরণ করে তিনি শহরের প্রায় অর্ধেক এলাকার দায়িত্বপালন করেন এবং স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত থামবেন না বলে দৃঢ়তা প্রকাশ করেন।