সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার সীমান্ত বিতর্কিত এলাকায় অবস্থিত লিবারল্যান্ড নামক একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে প্রথমে তেমন কিছু চোখে পড়ে না। সমতল, কর্দমাক্ত বন্যা সমভূমি, অ্যাল্ডার গাছ আর তাঁবু ও গাছের ঘরবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু এই অঞ্চলটি বিশ্বের কিছু শীর্ষ ধনী ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে রয়েছেন ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় প্রাথমিক বিনিয়োগকারী। লিবারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ভিট জেডলিচকা প্রতিষ্ঠিত এই মাইক্রোনেশনটি ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো একই প্রযুক্তিতে পরিচালিত একটি প্রকৃত উদারনৈতিক, ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।

জেডলিচকার মতে, এখানে 'লিবারল্যান্ড মেরিটস' নামক ক্রিপ্টো টোকেন কিনে একজন ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তিনি বলেন, যাদের বেশি মেরিট আছে, তারা দেশের নেতৃত্ব নির্বাচনে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ এখানে বিদ্যমান। লিবারল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান পারনার, যিনি ক্রোয়েশিয়ার একজন বিতর্কিত প্রাক্তন সংসদ সদস্য, তিনি জানান যে এই দেশটি সম্পূর্ণ করমুক্ত। তিনি বলেন, সাধারণত যারা স্বাধীনতা, বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থা ইত্যাদিতে বিশ্বাসী, তারা সমাজের উচ্চশ্রেণীর হয়ে থাকেন। যদি কোনো নির্বাচন ছাড়াই সবাইকে স্বাগত জানানো হয়, তবে যুক্তরাজ্যের মতো অবস্থা হবে—যা তারা চান না। পারনার আরও বলেন, দরিদ্রদের 'প্রাণী'র সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, তাদের খাওয়ালে তারা নিজেদের খাদ্য সংগ্রহের ক্ষমতা হারাবে। মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

লিবারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন সান, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার, তিনি এই মাইক্রোনেশনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সানের কোম্পানি ট্রন একটি ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য কম্পিউটারের মাধ্যমে লেনদেন পরিচালিত হয়, যা কর ও নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে। ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসায় সান ৭৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেমেকয়েনেও কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সানের সম্পর্ক থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্রিপ্টো শিল্পের বড় খেলোয়াড়রা কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে।

সিলিকন ভ্যালির বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী টিম ড্রেপার, যিনি ড্রেপার নেশন নামে একটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি মনে করেন সরকার 'উচ্চ খরচে খারাপ সেবা' দেয় এবং ব্লকচেইন তা প্রতিস্থাপন করবে—এটি শুধু সময়ের ব্যাপার। কার্টিস ইয়ারভিন নামক বিতর্কিত চিন্তাবিদ, যাকে 'ডার্ক এনলাইটেনমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা' বলা হয়, তিনি বিশ্বাস করেন গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং তার পরিবর্তে কর্পোরেশন, রাজতন্ত্র ও ব্লকচেইন-চালিত মাইক্রোনেশনের মিশ্রণে গঠিত কর্তৃত্ববাদী কাঠামো আসা উচিত। তাঁর 'প্যাচওয়ার্ক' ধারণায় প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন সার্বভৌম ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক তৈরি হবে, যেখানে 'সিইও-রাজা'রা শাসন করবেন এবং তারা লুকানো শেয়ারহোল্ডার বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করবেন, যারা এমনকি সামরিক ও পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন 'ক্রিপ্টো ডিঙ্গাস' নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে।

এই সব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, ক্রিপ্টো প্রযুক্তি ও ব্লকচেইন কীভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও সম্পদ চলে যায় যারা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে তাদের হাতে। ফক্স বিজনেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রিপ্টো লবি এখন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে শক্তিশালী লবিতে পরিণত হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী চক্রে ২৩৮ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে।