শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। সম্প্রতি ইইউ’র শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের প্ল্যাটফর্ম শিশুদের জন্য নিরাপদ বলে প্রমাণ করা। তিনি ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে মত দেন। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শিশুদের মানসিক বিকাশের ওপর সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক ফন ডার লেয়েন আরও জানান, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো প্রকার স্ক্রিনের সামনে রাখা উচিত নয়।

ফন ডার লেয়েনের মতে, বয়সভিত্তিক ধাপে ধাপে প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। কারণ শৈশব আর ফিরে আসে না। তিনি শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম আইনি বয়স নির্ধারণের পক্ষে মত দেন। তার ভাষায়, যেমন লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দেওয়া হয় না, তেমনি নির্দিষ্ট বয়সের আগে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না। বিশেষ করে ‘ইনফিনিট স্ক্রোলিং’–এর মতো আসক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

ইইউ’র শিশু অনলাইন সুরক্ষা বিশেষ প্যানেল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা অভিভাবকদের নয়, বরং সেবা প্রদানকারীদের ওপর বর্তাতে হবে। প্যানেলের মতে, যতক্ষণ না প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করতে পারে তাদের সেবা নিরাপদ, ততক্ষণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা উচিত। এই প্রতিবেদন ফন ডার লেয়েনের ভাবনাকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে প্যানেলটি ১৩ বছরের বেশি শিশুদের জন্যও ‘সতর্কতামূলক বয়সসীমা’ আরোপের সুপারিশ করেছে ইইউ সদস্য দেশগুলোকে।

শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যেই নানা বিধিনিষেধ এসেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ ১৫ বা ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য টিকটক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফন ডার লেয়েনের মতে, ১৩ বছরের কম বয়সীরা শুধুমাত্র অভিভাবক, শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ‘সময়সীমাবদ্ধ’ প্রবেশাধিকার পেতে পারে। কিশোরদের জন্য বয়সোপযোগী ও নিরাপদ প্রমাণিত প্ল্যাটফর্মে ধীরে ধীরে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

ইইউ কমিশন ইতিমধ্যেই ডিজিটাল সেফটি অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। গত সপ্তাহেই ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, ইনফিনিট স্ক্রোলিংয়ের মতো আসক্তিমূলক ডিজাইন সরানো না হলে জরিমানার মুখে পড়তে হবে। মেটা ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে ১৩ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও এই বিধিনিষেধ সহজেই এড়ানো যায় বলে সমালোচনা রয়েছে। ইইউ’র ডিজিটাল রেগুলেটররা এর আগেই মেটাকে অভিযুক্ত করেছিল যে, তারা প্ল্যাটফর্মে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইইউ কমিশন নিজস্ব একটি বয়স যাচাই অ্যাপ তৈরি করছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পরিচয় গোপন রেখে বয়স প্রমাণ করতে পারবেন। ফন ডার লেয়েনের নীতিগত প্রস্তাব ইইউ সদস্য দেশগুলোর ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। আগামী দিনে ২৭ সদস্যের এই জোটের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব আনতে পারে কমিশনের নির্বাহী শাখা। কানাডার টরন্টো থেকে সংবাদটি প্রতিবেদন করেছেন।