সংখ্যার অনুপস্থিতিতে আমাদের জীবন কেমন হতো, তা ভেবে হয়তো আনন্দই লাগে। কিন্তু আদিম মানবের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, শিকার গোনার মধ্য দিয়েই পৃথিবীকে সহজে বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে সংখ্যার ব্যবহার শুরু হয়। মানব সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যার জগত আরও আধুনিক ও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে। প্রতিটি নতুন বাস্তব সমস্যার মোকাবিলায় মানুষ নতুন ধরনের সংখ্যা আবিষ্কার করেছে।

সংখ্যার প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হলো গণনা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, আয়তন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার — এর মতো তথ্য সংখ্যার মাধ্যমেই প্রকাশ করা যায়। গণনার যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত সাদামাটাভাবে, একটি হরিণ, দুটি গাছ বা আকাশের তিনটি তারার হিসেবে। ধরুন, চার সদস্যের একটি পরিবারে প্রতিদিন দুই জগ করে পানি লাগে এবং একটি বাগানে আরও তিন জগ প্রয়োজন। তখন মোট পানি হবে (৪ x ২) + ৩ = ? এই অজানা বিষয়টিকে ইংরেজি x বা y-এর বদলে বাংলায় ‘ক’ ধরে নিলে আমরা লিখতে পারি (৪ x ২) + ৩ = ক। এটি একটি সমীকরণ, এবং সরল হিসাবে এর সমাধান ক = ১১। কিন্তু সব সমীকরণই এত সরল নয়।

যখন ভাগাভাগির প্রশ্ন ওঠে, তখন থেকেই আসে নতুন সংখ্যার ধারণা। ভাবুন, এক শিকারির কাছে একটি মাত্র খরগোশ আছে, কিন্তু সন্তান দুইজন। পুরো খরগোশ তো আর দুইজনকে আস্ত দেওয়া যায় না। গোটা সংখ্যার জগতে এর কোনো সমাধান না থাকায় আবির্ভাব ঘটে ভগ্নাংশের, যাকে গণিতের পরিভাষায় বলা হয় মূলদ সংখ্যা। যে সংখ্যাকে দুটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে লেখা সম্ভব, তাই মূলদ সংখ্যা। যেমন, একটি পিৎজার চার টুকরার মধ্যে তিন টুকরা খেলে তা হবে ৩/৪ অংশ। এখানে ৩ ও ৪ উভয়ই পূর্ণসংখ্যা, ফলে ৩/৪ একটি মূলদ সংখ্যা। তবে নিচে শূন্য থাকলে তা আর মূলদ সংখ্যা হয় না; বস্তুত কোনো কিছুকে শূন্য দিয়ে ভাগ করা সম্ভব নয়। দশমিক সংখ্যাও মূলদ হতে পারে, যদি তা শেষ হয়ে যায় বা একই প্যাটার্নে চলতে থাকে। যেমন ৩/৪ = ০.৭৫, এবং ১/৩ = ০.৩৩৩৩৩…—উভয়ই মূল্য। কিন্তু যদি কোনো প্যাটার্ন না থাকে, যেমন ০.৩৫১৭৯৬২১৭৪…, তবে তা অমূলদ সংখ্যা; উদাহরণ হিসেবে পাই এর কথা বলা যায়।

এরপর কৃষি ও বাণিজ্য সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে ঋণ ও লোকসানের হিসাব রাখার প্রয়োজন দেখা দিল। মনে করুন, ছোট বোনের কাছ থেকে ৫টি চকলেট ধার নেওয়া হলো। চকলেটের পরিমাণ এখন শূন্যেরও কম। এই অবস্থায় আবির্ভাব হলো ঋণাত্মক সংখ্যা (যেমন -১, -২, -৩) এর। এটি যোগ-বিয়োগভিত্তিক যেকোনো সমীকরণ সমাধান সম্ভব করে তুলল। আগে ক + ৪ = ৩ সমীকরণটিকে অর্থহীন মনে হতো, কিন্তু এখন সহজেই বোঝা যায় ক = -১, অর্থাৎ ১ টাকা ঋণ ছিল। ঋণাত্মক সংখ্যার জগতে দুটি মাইনাস সংখ্যার গুণ করলে ধনাত্মক ফল পাওয়া যায়, যেমন (-৫) x (-৩) = ১৫। বিয়োগের ক্ষেত্রে (-৩) - (-৫) = ২, কারণ মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়ে যায়। একটি উদাহরণ: প্রতিদিন ২টি করে আপেল দিলে ৩ দিন পরে মোট ৬টি আপেল দেওয়া হবে (২ x ৩ = ৬)। অন্যদিকে, আজ যদি ১০টি আপেল থাকে এবং জানা যায় প্রতিদিন ২টি করে দেওয়া হয়েছে, তবে ৩ দিন আগে আপেল ছিল ১৬টি। একইভাবে, যদি কেউ প্রতিদিন ২টি করে আপেল দেয়, তবে ৩ দিন পরে আপেল ৬টি বাড়বে: (-২) x (-৩) = ৬।

কিন্তু শুধু মূলদ সংখ্যা দিয়েই সব জ্যামিতিক হিসাব মিলে না। এক সেন্টিমিটার বাহুবিশিষ্ট একটি বর্গের কর্ণের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে গিয়ে পাওয়া যায় √২। পিথাগোরাসের সূত্র অনুযায়ী, অতিভূজের বর্গ = বাকি দুই বাহুর বর্গের যোগফল। এখানে কর্ণ ‘ল’ হলে ল২ = ১ + ১ = ২, বা ল = √২। কিন্তু এমন কোনো নিখুঁত ভগ্নাংশ নেই যা দিয়ে √২-কে প্রকাশ করা যায়। আধুনিক গণিতে এটিই অমূলদ সংখ্যা, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাই (π)। সংখ্যারেখার উপরে মূলদ সংখ্যাগুলোর মাঝখানে থাকা ফাঁকা স্থানগুলো পূরণ করে এই অমূলদ সংখ্যাগুলো। উনিশ শতকে এই ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করেই মূলদ ও অমূলদ সংবলিত শক্তিশালী বাস্তব সংখ্যার সিস্টেম গড়ে তোলা হয়। বাস্তব সংখ্যা দুই ভাগে বিভক্ত: মূলদ ও অমূলদ।

তবু বাস্তব সংখ্যাতে সব সমীকরণের সমাধান পাওয়া যায় না। যেকোনো সংখ্যাকে নিজের সাথে গুণ করলে ফল ধনাত্মক হয়, ফলে ক² = -১ সমীকরণের বাস্তব সমাধান নেই। এ সমস্যার জট খুলতে ষোড়শ শতকে ইতালীয় গণিতবিদেরা জটিল সমীকরণ সমাধানের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। অঙ্ক করতে গিয়ে অনেক সময় √-১ (রুট মাইনাস ১) চলে আসত, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। প্রাথমিকভাবে অর্থহীন মনে হলেও পর্যবেক্ষণে দেখা গেল, শেষ পর্যন্ত এই কাল্পনিক পদগুলো একে অপরকে বাতিল করে দেয় এবং একটি বাস্তব সমাধান দাঁড়ায়। এভাবেই জন্ম নেয় ইমাজিনারি নম্বর বা কাল্পনিক সংখ্যা, যার প্রতীক i, অর্থাৎ i = √-১। বাস্তব ও কাল্পনিক সংখ্যার সম্মিলিত রূপই হলো জটিল সংখ্যা, যেমন ৪ + ৩i। এগুলোও সাধারণ সংখ্যার মতো যোগ-গুণ করা যায়। ঊনবিংশ শতকে গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস যুগান্তকারী প্রমাণ করেন যে, এই জটিল সংখ্যা ব্যবহার করেই পৃথিবীর যেকোনো বহুপদী সমীকরণের সমাধান সম্ভব। হাজার বছরের সংখ্যার খোঁজের এই পরিণতি মেলায়, মানুষের আর কোনো নতুন সংখ্যা উদ্ভাবনের প্রয়োজন ফুরোলো।