ছয় বছর আগে নিজের কাছে করা একটি প্রতিজ্ঞা পূরণের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলেন নীলা সরকার ঐশী। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি তাঁর নীরব সংগ্রামের এক বড় মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ২০২৬ সালের ১৮ জুনের সেই পরীক্ষার হলে উপস্থিত লোকজনের অধিকাংশই হয়তো জানতেন না, এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, নিঃসঙ্গ টিকে থাকার লড়াই এবং স্বয়ং নিজের কাছে দেওয়া একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। থিসিস ডিফেন্সে A+ প্রাপ্তি ছিল তাঁর এই ছয় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরিপূর্ণ প্রতিদান।
খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর নীলার পুরো পৃথিবী হয়ে উঠেছিলেন তাঁর মা, যিনি ছিলেন একক শক্তির উৎস। কিন্তু ২০২০ সালে মাকেও চিরতরে হারিয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। একজন অভিভাবকহীন মেয়ের জীবন আমাদের সমাজে কীভাবে অন্যদের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে, তারও অভিজ্ঞতা হয়েছে নীলার। পরিবার তার ভবিষ্যৎ ও ক্যারিয়ার নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা সাজালেও তিনি নিজের স্বপ্নের সাথে কোনো সমঝোতা করতে রাজি হননি। দ্বিমত এমন তীব্র হয় যে, তিনি এক পর্যায়ে পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে আসার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন একা মেয়ের জন্য এই সিদ্ধান্ত এবং তার পরবর্তী লড়াই কতটা কঠিন ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
মায়ের ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর বাড়িতেই ওই সংকটকালে আশ্রয় পান তিনি, যাকে নীলা ‘ছোট আম্মু’ সম্বোধন করেন। তাঁর মতে, ছোট আম্মু যে নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আশ্রয় দিয়েছিলেন, তার কোনো তুলনা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুটা হয়েছিল মায়ের সঞ্চিত সামান্য কিছু টাকা নিয়ে। টিউশনি করেই চলত তার নিজের ভরণপোষণ ও শিক্ষাব্যয়। এক টিউশনি হারানোর পর তৃতীয় সেমিস্টারে ভয়াবহ অর্থসংকটে পড়ে তিনি সোনার কানের দুল বিক্রি করে ফি জোগাড় করতে বাধ্য হন। তারপরও টাকার অভাব পিছু ছাড়েনি, ফলে টানা দুইটি সেমিস্টার ড্রপ দিতে হয়েছিল।
নতুন বাসায় ওঠা ও দুটি নতুন টিউশনি জোগাড়ের পর আবার পড়ালেখা শুরু হয়। এই সময় তিনি একটি সাহসী পদক্ষেপ নেন—আইইএলটিএস কোর্সে ভর্তি হওয়া। নিজের অল্প সঞ্চয় আর এক বন্ধুর থেকে ধার করা টাকায় সেই কোর্সে ভর্তি হন তিনি। নীলার ভাষায়, এই কোর্সই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কারণ এখানেই পরিচয় হয় হাবিব ভাইয়া ও মোস্তাকিম স্যারের সাথে, যাদের তিনি নিজের ‘লাইফের গেমচেঞ্জার’ বলে অভিহিত করেন। কোর্স শেষ হওয়া মাত্রই মোস্তাকিম স্যার তাকে চাকরির সুযোগ দেন, যদিও তখন নীলা একটি কম্পিউটার চালু করতেও জানতেন না। অনির্দিষ্ট ধৈর্য্য ধরে মোস্তাকিম স্যার তাঁকে হাতেকলমে সবকিছু শিখিয়েছেন। চাকরি ও পড়ালেখার কঠোর চাপে বহুবার বিদায় নেওয়ার চিন্তা এলেও স্যারের সেই বিখ্যাত পরামর্শ— ‘নীলা, আপনি জাস্ট লেগে থাকেন কাজ আর ক্যারিয়ার নিয়ে’— তাকে আটকে রেখেছে।
পারিবারিক কোনো আর্থিক সহায়তা না থাকায় আকস্মিক অর্থসংকট প্রায় নিয়মিত ব্যাপার ছিল। যখন আবার একটি সেমিস্টার ড্রপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তখন হাবিব ভাইয়া বলেছিলেন, ‘টাকা আমি ম্যানেজ করে দিচ্ছি, আপনি সুবিধামতো দিয়েন।’ সেই সাহায্য তাকে আর কোনো সেমিস্টার বাদ দিতে দেয়নি। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে একটি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন তিনি। পুরো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট জীবনই এখানে কাজ করেই পার করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির অফিসের সবার অমুল্য সমর্থন ছাড়া এই অর্জন কল্পনাই করা যেত না। সহকর্মী কায়নাত আরথি, সোনিয়া আক্তার, মাসুম বিল্লাহ আরিফ সহ অনেকের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও সর্বোচ্চ সহায়তা করেছেন।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের বন্ধু জোনায়ের আহাম্মেদকে তিনি মনে করেন ‘ব্লেসিং’। কলেজের বান্ধবী সানজিদা, নাফিসা এবং অত্যন্ত কাছের বন্ধু নাদিয়া নিপা সবসময় তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তীব্র আরপেক্ষর সুরে নীলা জানান, তিনি শুধুমাত্র পরিবারের কাছ থেকে কখনোই সম্মানটি পাননি, যদিও সেটিতে তার কিছু যায় আসে না। একদিন সকলকে ছেড়ে বের হওয়ার সময় যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন কেউ যাতে তার দিকে আঙুল তুলতে দুবার ভাবে, তা আজ তিনি পুরণ করেছেন। বর্তমানে তাঁরই সহযোগিতায় লেখা ‘Next Level IELTS’ বইটি রকমারির বেস্ট সেলার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। থিসিস ডিফেন্সের দিনটি ছিল তাঁর কাছে মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতি এক অর্থপূর্ণ জবাব, যিনি না থেকেও নিজের শক্তি জুগিয়েছিলেন এই মেয়েকে।




