বাংলাদেশের জ্ঞানতাপস ফকির লালন সাঁইয়ের সংগীত সাধনার ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন গবেষক সাইমন জাকারিয়া। তিনি তাঁর প্রবন্ধে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন: লালন সাঁই কি নিজে গান পরিবেশন করতেন? তাঁর গানের কোনো পাণ্ডুলিপি আছে কি? এবং তাঁর গানের সুর কি অডিও বা ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে সংরক্ষিত আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে তিনি ঐতিহাসিক দলিল ও সূত্রের সাহায্য নিয়েছেন।

লালন সাঁইয়ের দেহত্যাগের মাত্র ১৪ দিন পর কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত ‘হিতকরী’ পত্রিকায় ‘মহাত্মা লালন ফকির’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লালন ফকিরের নাম এ অঞ্চলে সবার জানা। পূর্বে চট্টগ্রাম, উত্তরে রংপুর, দক্ষিণে যশোর ও পশ্চিমে বহুদূর পর্যন্ত তাঁর শিষ্য ছড়িয়ে ছিল, যার সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পীড়িত অবস্থায়ও লালন সাঁই পরমেশ্বরের নামে সাধনা করতেন এবং গানে উন্মত্ত হয়ে যেতেন। ধর্মালাপ পেলে রোগের যন্ত্রণা ভুলে যেতেন। তাঁর পীড়িতকালের রচিত কয়েকটি গান প্রতিবেদকের কাছে ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।

দেহত্যাগের আগের রাত সম্পর্কে লালনপন্থী সাধক ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ’র বর্ণনায় বলা হয়েছে, লালন সাঁই শিষ্যদের উদ্দেশে উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি গান গেয়েছিলেন। ভোরের দিকে তিনি শিষ্যদের বলেন, ‘আমি তোমাদের একটা গান শোনাব। মনিরুদ্দিন, তুমি গানটি লিপিবদ্ধ করো।’ এরপর তিনি ‘পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে’ গানটি প্রাণঢালা সুরে গেয়ে শেষ করেন। গানের শেষ কলি শেষ করে তিনি চাদর মুড়ি দিয়ে নীরব হয়ে যান। শিষ্যরা বুঝতে পারেননি যে তাঁদের প্রাণপ্রতিম ‘গানের পাখী’ শেষ কলি গাইতে গাইতেই ইহলীলা শেষ করেছেন।

লালন সাঁইয়ের জীবদ্দশায় তাঁর গানের প্রথম মুদ্রণ হয় ১৮৮৫ সালে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত ‘কাঙ্গালের ব্রহ্মা-বেদ: আত্ম ও সাধনতত্ত্ব’ গ্রন্থের ‘উপাসনা’ অংশে ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা’ গানটি মুদ্রিত হয়। পরবর্তী সময়ে নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়, সরলা দেবী, সতীশচন্দ্র দাস, করুণাময় গোস্বামী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকেই লালনের গান মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করেন।

লালন সাঁইয়ের গানের প্রথম স্বরলিপি প্রকাশ করেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘বীণা-বাদিনী’ পত্রিকার ১৮৯৮-৯৯ সংখ্যায় ‘পারমার্থিক গান’ শিরোনামে ‘ক্ষম অপরাধ ও দীননাথ’ ও ‘কথা কয় কাছে দেখা যায় না’ গান দুটির স্বরলিপি প্রকাশ করেন। প্রায় এক শতাব্দী পরে ১৯৮৫ সালে সংগীতসাধক সুধীন দাস লালন সংগীতের মূল সুরকে বিকৃতি থেকে রক্ষা ও উত্তরসূরিদের জন্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে স্বরলিপি প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। তিনি খোদাবক্শ সাঁইয়ের গীত লালনের শতাধিক গানের অডিও রেকর্ডিং করেন এবং ১৯৮৬ ও ২০০৭ সালে দুটি গ্রন্থে লালনের ৭০টি গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন।

খোদাবক্শ সাঁইয়ের কণ্ঠ থেকে আমেরিকার ড. ক্যারোল সলোমন, জাপানের মাসাইয়্যুকি ওনিশি, আজাদ রহমান ও তপন মজুমদার প্রমুখ লালনের শত শত গান রেকর্ড করেন। ড. ক্যারোল সলোমনের রেকর্ডিংগুলো ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের এথনোমিউজিকোলজি বিভাগের ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া মকছেদ আলী সাঁই, মহিন শাহ, করিম শাহ প্রমুখের গীত লালনের শতাধিক গানের অডিও রেকর্ডিং লভ্য।

লন্ডনপ্রবাসী রঙ্গন মোমেন ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বাউল-ফকির ও সাধকের নিকট থেকে তিন হাজার গানের সুর-বাণীর অডিও রেকর্ড করেন, যার মধ্যে লালনের প্রায় ৬৫০টি গান রয়েছে। লালনের প্রামাণ্য গানের সংখ্যা প্রায় ৬৫০। এসব গানের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যরাই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। মূল পাণ্ডুলিপি গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামের লালনপন্থীদের কাছে এবং ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার লালনপন্থী সাধকদের অন্দরমহলে সংরক্ষিত আছে। তবে এসব পাণ্ডুলিপি গুপ্ত বস্তুর মতো ব্যক্তিবিশেষের নিকট থাকায় সেগুলো সহজপ্রাপ্য নয়।

গবেষক সাইমন জাকারিয়া উল্লেখ করেছেন, লালনের গানের বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে অন্যের রচিত গানকে লালনের নামে প্রচারের প্রবণতা বেড়েছে। মিডিয়াকেন্দ্রিক গান পরিবেশনে বাণিজ্যিক শিল্পীদের অধিকাংশই লালনের গানের ভাব, বাণী, সুর ও সাধনার বিষয়ে মনোযোগী নন। বসন্তকুমার পাল ১৯২৫ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘ফকির লালন সাহ্’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে লিখেছেন, লালন সাঁইয়ের মন ‘অধর মানুষ’ ধরার প্রবল বাসনায় সর্বদা আকুল থাকত। তাঁর অন্তরের ভাবরাশি যখন দু’কূলপ্লাবিনী তটিনীর মতো উথলে উঠত, তখন তিনি শিষ্যদের ডেকে বলতেন, ‘ওরে আমার পুনা মাছের ঝাঁক এসেছে।’ শুনামাত্র শিষ্যরা ছুটে আসত এবং সাঁইজী ভাবের আবেশে গান ধরতেন। শিষ্যরাও সঙ্গে সঙ্গে গেয়ে চলত। সময়-অসময় বলে কিছু ছিল না, সদা-সর্বদাই এই ‘পোনা মাছের ঝাঁক’ আসত।

লেখক শেষে বলেছেন, লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরের যুগলবন্ধনকে পৃথক করা সংগত নয়। সাঁইজি নিজেও কখনো তাঁর বাণী ও সুরকে আলাদা বিবেচনা করেননি। তাই সেই সত্য মেনে নিয়ে ফকির লালন সাঁইকে সম্মান ও সমাদর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।