দেশের অন্যতম পুরোনো যশোর বিমানবন্দর বর্তমানে তীব্র যাত্রীসংকটের মুখোমুখি। অতীতে এ বিমানবন্দর দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮টি ফ্লাইট ওঠানামা করলেও এখন পুরো সপ্তাহে উড়োজাহাজ চলাচল করে মাত্র ৯টি। এর মধ্যেও অধিকাংশ ফ্লাইট ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে আকাশে ওড়ে। এমন বাস্তবতায় আগামী ১৬ জুলাই থেকে যশোর-ঢাকা রুটে নিজেদের সব ফ্লাইট তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের যশোর ব্যবস্থাপক সাব্বির হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ২০২২ সালে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে প্রতিদিন কমপক্ষে ১৪টি ফ্লাইট যশোর ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে দৈনিক একটিতে, আর সেটিরও অর্ধেক আসন ফাঁকা থেকে যায়। তিনি জানান, তিন মাস পর যাত্রীর চাহিদা বাড়লে পুনরায় ফ্লাইট পরিচালনা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিমান সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, যশোর বিমানবন্দরের যাত্রীদের একটি বড় অংশ আগে খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলা থেকে আসতেন। পদ্মা সেতুর ফলে সড়কপথে দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন এই দুই জেলা থেকে বিমানযাত্রী প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে, যা যাত্রীসংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, পূর্বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা ও নভোএয়ার নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করত। এখন শুধু ইউএস-বাংলা প্রতিদিন একটি করে এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে যশোর-ঢাকা রুটে পুরো সপ্তাহে কেবল দুটি ফ্লাইট চলবে। এতে বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা ট্রাভেল এজেন্সি, ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক এবং আশপাশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা কর্মহীন হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন। স্থানীয় এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক গিয়াস উদ্দিন বাদশা বলেন, ‘একসময় প্রতিদিন ১৮টার বেশি ফ্লাইট হতো। সেটি কমতে কমতে এখন একটিতে এসে ঠেকেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন এজেন্সি ও পরিবহনের ওপর। আমরা কর্মহীন হয়ে পড়ছি, পরিবার নিয়ে বিপাকে আছি।’ তার অভিযোগ, টিকিটের মূল্য বেশি হওয়ায় মানুষের আগ্রহ কমেছে।

এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ অবশ্য ভাড়া বেশি হওয়ার পেছনে যাত্রীস্বল্পতাকেই দায়ী করছে। ইউএস-বাংলার ব্যবস্থাপক সাব্বির হোসেন স্বীকার করেন, যশোর-ঢাকা রুটের ৫ হাজার ৮০০ টাকা ভাড়া তুলনামূলক বেশি। কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেন, অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে ফ্লাইট পরিচালনা করতে গেলে এই ভাড়া না নিয়ে উপায় কী? সেই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও বিমানবন্দরের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাভেল এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব যশোরের সাধারণ সম্পাদক অরুণ মজুমদার প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় যশোর থেকে ঢাকার নিয়মিত ফ্লাইট চালুর দাবি জানান। তার ভাষ্য, এই রুটের অতিরিক্ত ভাড়া কমিয়ে অন্য রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করলে যাত্রী আবার ফিরবে। যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় যশোর বিমানবন্দর সচল রাখার ওপর জোর দেন। তিনি যুক্তি দেখান, এ অঞ্চলে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর ও নৌবন্দর অবস্থিত, পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী রয়েছেন। তাই পদ্মা সেতু চালু থাকলেও কাঁচা ফুল ও সবজি সরাসরি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগাতে এই বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।