ইংল্যান্ডের মাটিতে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ফুটবলার ফারহান আলী ওয়াহিদকে ঘিরে দেশের ফুটবলাঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯ বছর বয়সী এই প্রতিভাবান উইঙ্গার বর্তমানে ইংলিশ ক্লাব ফুলহামের মূল দলে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টায় আছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) তাকে জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সিতে দেখতে মরিয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু অগ্রসর হলে আগামী সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতিতেই তার অভিষেক ঘটে যেতে পারে। এমনকি নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তার উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছে।

ফারহান ইতিমধ্যেই ফুলহামের মূল দলের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন। গত পরশু নরউইচ সিটির বিপক্ষে একটি প্রাক্-মৌসুম প্রীতি ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামেন তিনি। স্প্যানিশ কোচ আলভারো আরবেলোয়ার নির্দেশনায় মাঠে নেমে বাঁ দিকের উইং ধরে দারুণ এক ড্রিবল শেষে তার নেওয়া শক্তিশালী ও বাঁকানো শট প্রতিপক্ষ গোলরক্ষককে পরীক্ষায় ফেলে। যদিও ম্যাচটি ফুলহাম ২-০ গোলে পরাজিত হয়, ফারহান নিজের সক্ষমতার ছাপ রেখে সবার নজর কাড়েন।

ফুলহামের মূল দলের জার্সি গায়ে প্রিমিয়ার লিগে নামতে পারলে তিনি হামজা চৌধুরীর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি বাউনোদ্ভূত খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ এই লিগে মাঠে নামার ইতিহাস গড়বেন। ফারহানের জন্ম ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডে, তার সিলেটি বাবা-মা উভয়ের জন্মও সেখানেই। দাদা-নানার সূত্র ধরে বাফুফে দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বাংলাদেশের হয়ে খেলানোর চেষ্টা করছে। এমধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রাপ্তির একটি বড় শর্ত পূর্ণ হয়েছে, তার জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি হয়ে গেছে।

বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে অপেক্ষা করা হচ্ছে ফারহানের সময় দেওয়ার জন্য। বাফুফে লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য তার একটু সময় চাইবে। বায়োমেট্রিক পর্ব সম্পন্ন হলেই দ্রুত তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু হবে। এরপর ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) থেকে অনাপত্তি সনদ (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) হাতে এলে সেপ্টেম্বরের ফিফা উইন্ডোতে তার জাতীয় দলে আত্মপ্রকাশের পথ একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

বাফুফের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম এই ব্যাপারে গণমাধ্যমকে আশাবাদ জানিয়ে বলেছেন, “সেপ্টেম্বরের উইন্ডোতে ফারহানকে পেতে যা কিছু প্রয়োজনীয়, সব করা হচ্ছে। প্রতিটি বিষয় সঠিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, ওই উইন্ডোতেই আমরা ফারহানকে পাব। আর নভেম্বরের সাফের ক্ষেত্রে তো কোনো সংশয়ই নেই।”

ফুটবলার হিসেবে ফারহানের উত্থান আশাব্যঞ্জক। চেলসির একাডেমিতে তার হাতেখড়ি হলেও ২০১৯ সালে অনূর্ধ্ব-১২ পর্যায়ে ফুলহামের নজরে আসেন। ২০২৪ সালের শুরুতে ক্লাবের অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে তার অভিষেক ঘটে। গত বছর ফুলহামের সাথে প্রথম পেশাদার চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ টু-তে দুর্দান্ত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে নভেম্বর মাসে তিনি জেতেন মাসের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এমনকি মৌসুম শেষে বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও নিজের নাম লিখিয়েছেন।

এদিকে ফারহানের পাশাপাশি, বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ টসাস ডুলি ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা আরও একজন বাংলাদেশি বাউন্বূত ফুটবলার জায়ান হাকিমকে দলে টানার বিষয়ে ইতিবাচক সম্মতি দিয়েছেন। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড জায়ান বর্তমানে ইংল্যান্ডের বারওয়েল ফুটবল ক্লাবে খেলছেন। ২০২৩ সালে তিনি ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার জাতীয় দলের জার্সিতে দুটি আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলেছিলেন। বাফুফে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে সামনে রেখে তারও সেবা পাওয়ার আশা করছে।

দুই যুগের বেশি সময় ধরে সাফের শিরোপা খরায় ভুগতে থাকা বাফুফে এবার এই ট্রফি জয়ের ব্যাপারে মরিয়া। আরও চার থেকে পাঁচজন বিদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে আনতে কাজ করছে সংস্থাটি। সেপ্টেম্বরের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে তাদের মধ্যে তিন-চারজনকে মাঠে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ জাতীয় দল ক্রমশই প্রবাসী বাউন্বূত খেলোয়াড়নির্ভর হয়ে উঠছে। বর্তমানে দলে জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজী, কাজেম শাহ, হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, ফাহামিদুল ইসলাম, জায়ান আহমেদ ও কিউবা মিচেলসহ আট জন প্রবাসী ফুটবলার আছেন।

এছাড়া, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান ফিফা উইন্ডোতে বাফুফে নিজেদের মাঠে একটি চারজাতি টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। এ সময়ে কিরগিজস্তান বাংলাদেশকে তাদের দেশে সফরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও, বাফুফে চাচ্ছে কিরগিজস্তানই ঢাকায় এসে এই টুর্নামেন্টে অংশ নিক। শেষ পর্যন্ত যদি চারজাতির এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, তবে তরুণ তারকা ফারহান আলী ওয়াহিদের বাংলাদেশের দর্শকদের সামনেই লাল-সবুজ জার্সিতে অভিষেক ঘটতে পারে।