মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ফলিত অর্থনীতির অধ্যাপক স্টিভ হ্যাঙ্কে দীর্ঘ চার দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাইপারইনফ্লেশন মোকাবিলায় কাজ করে আসছেন। তার সমাধানের মূল কৌশল হলো স্থানীয় মুদ্রাকে মার্কিন ডলারের সাথে বেঁধে দেওয়া, যাতে সরকার অতিরিক্ত মুদ্রা ছেপে ব্যয় মেটানোর সুযোগ না পায়। এই সাফল্যের কারণে তিনি ‘মানি ডক্টর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার জাতীয় সংসদ তাকে অর্থনীতি, মুদ্রা ও জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। নিকোলাস মাদুরো সরকারের পতনের পর দেশটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, কিন্তু বার্ষিক ৪০০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
হ্যাঙ্কে এই সমস্যা সমাধানে বোলিভার মুদ্রা সম্পূর্ণ বাতিল করে ডলার চালু করার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ করার একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছেন। ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জাতীয় সংসদে এই আইন পাস হওয়ার সম্ভাবনা তিনি ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ দেখছেন। তার মতে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই ভেনেজুয়েলায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর চাবিকাঠি। স্থিতিশীলতা না থাকলে অন্য কিছুই সম্ভব নয়, আর স্থিতিশীলতার মানেই হলো স্থিতিশীল দাম।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির সাথে তেলের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষের এই দেশটির বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুদ রয়েছে। কিন্তু দেশটি বর্তমানে দৈনিক মাত্র ১১ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে, যা ১৯৯৮ সালে চাভেজের আগের সময়ের উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ। দেশটির বিপুল বৈদেশিক ঋণের বোঝা মেটাতেও তেল খাতের পুনরুদ্ধার জরুরি। তবে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো এখনো বিনিয়োগে আগ্রহী নয়, কারণ তারা মাদুরো ও চাভেজের শাসনামলের মতো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঝুঁকি দেখছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-র সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখন মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব রয়েছে।
হ্যাঙ্কে উল্লেখ করেছেন, ভেনেজুয়েলার মুদ্রাস্ফীতি মাদুরোর পতনের আগে ৭০০ শতাংশে ছিল, যা এখন ৪০০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু তবুও এটি ইরানের তুলনায় ৬ গুণ বেশি। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রতি সপ্তাহে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, তেল রাজস্ব শুকিয়ে যাওয়ায় সরকার মুদ্রা ছেপে খরচ মেটাচ্ছে, যা এখনো অব্যাহত আছে।
ভেনেজুয়েলায় ডলার চালুর এই উদ্যোগটি তার দ্বিতীয় প্রচেষ্টা। ১৯৯৫-৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি রাফায়েল ক্যালদেরার প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি একটি কারেন্সি বোর্ডের নকশা করেছিলেন, কিন্তু তা সংসদে পাস হয়নি। তবে এবার তিনি আশাবাদী, কারণ জরিপে দেখা যাচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভেনেজুয়েলীয়রা বোলিভারের পরিবর্তে ডলার গ্রহণ করতে চায়। তিনি বলছেন, ১৯৯৯ সালে ইউরো চালুর পর থেকে এটি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় মুদ্রা পরিবর্তন।
তবে ডলারাইজেশন বিতর্কিত একটি পদক্ষেপ। সমালোচকরা বলছেন, এটি একটি দেশের মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কেড়ে নেয় এবং সংকটের সময় ঋণদাতা হিসেবে কাজ করার সক্ষমতা হ্রাস করে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ২০২৩ সালে ডলারাইজেশনের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তা বাদ দিয়েছেন। হ্যাঙ্কে অবশ্য মনে করেন, বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ মুদ্রাস্ফীতির মুখে এই ত্যাগ স্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত।
হ্যাঙ্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ডলারাইজেশন হলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। তেল খাতে বড় বিনিয়োগ আসবে, ভাঙা বিদ্যুৎ অবকাঠামো মেরামত হবে এবং ঋণ পুনর্গঠন সহজ হবে। তিনি বলেন, দেশটিতে এখন ভোক্তা ঋণ প্রায় বন্ধ। ডলারাইজেশনের ফলে সৃষ্ট নতুন ঋণ বাজার ব্যবসা ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে।
হ্যাঙ্কের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি মন্টিনিগ্রো, ইকুয়েডর ও জিম্বাবুয়ের মতো দেশে ডলার বা ইউরো চালু করতে সফল হয়েছেন। তিনি মনে করেন, ভেনেজুয়েলা হবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন এবং নিজের খরচ নিজেই বহন করেন, যাতে তিনি স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারেন। তিনি বলেন, কোনো দেশের নেতারা নিজেরাই তার কাছে সাহায্য চান, তিনি কখনো নিজে এগিয়ে যান না।
তেল নীতির বিষয়ে হ্যাঙ্কে ভেনেজুয়েলাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কৌশল অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন, অর্থাৎ সর্বোচ্চ পরিমাণে তেল উত্তোলন করা। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুদ কিন্তু উৎপাদন অত্যন্ত কম, ফলে এর প্রকৃত মূল্য অনেক কম। তার মতে, ভেনেজুয়েলার উচিত ওপেকের কাছ থেকে বড় কোটা আদায়ের চেষ্টা করা, আর তা না পেলে ওপেক ছেড়ে দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো।
এখন ভেনেজুয়েলায় এক ধরনের ‘স্বতঃস্ফূর্ত ডলারাইজেশন’ চলছে। দোকানপাটে সব দাম ডলারে লেখা হচ্ছে এবং লেনদেনও ডলার বা ডলার-সমর্থিত ক্রিপ্টোকারেন্সি টিথারের মাধ্যমে হচ্ছে। তবে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা এখনো বোলিভারে বেতন পান, যার মূল্য প্রতি মাসে এক-তৃতীয়াংশ কমে যাচ্ছে। হ্যাঙ্কের সাথে কাজ করা ইকুয়েডরের অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকো জালেস বলেছেন, ভেনেজুয়েলীয়রা ইতিমধ্যে তাদের পছন্দের মুদ্রা বেছে নিয়েছে; তারা তাদের ওয়ালেট দিয়ে ভোট দিচ্ছে, আর সেটা হচ্ছে ডলার।




