‘আম কাঁঠালের ছুটি’র পর তিন বছরের ব্যবধানে নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হলেন নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। শুক্রবার দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তার দ্বিতীয় ছবি ‘মাস্তুল’। নদী, বন্দর ও প্রান্তিক মানুষের জীবন এই সিনেমার মূল উপজীব্য।
ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি তেলের ট্যাংকারের বৃদ্ধ পাচক এবং বন্দর এলাকার এক পথশিশুকে ঘিরে। এই দুই চরিত্রের সম্পর্কের জটিল বুননের মাধ্যমে পরিচালক ভাসমান জনগোষ্ঠীর জীবন, বিচ্ছিন্নতা, স্নেহ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও টিকে থাকার সংগ্রামের চিত্র এঁকেছেন।
‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমাটি ২০২৩ সালে মুক্তি পেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল। এরপর নূরুজ্জামান আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু মূল চরিত্রের জন্য নির্বাচিত অভিনেতা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। একদিন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে সহকর্মী নির্মাতা যুবরাজ শামীমের সঙ্গে বসে থাকার সময় একটি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে দেখেন। সেই দৃশ্যই ‘মাস্তুল’-এর গল্পের বীজ বুনে দেয়। জাহাজটিতে কয়েকদিন যাতায়াতের পর গল্পটি শক্ত ভিত পায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিত্রনাট্য রচিত হয়।
২০১৯ সালের মার্চ মাসে শিল্পী নির্বাচন সম্পন্ন করে ওই জাহাজেই শুটিং শুরু করেন নূরুজ্জামান। ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত এই সিনেমাটির দৃশ্যধারণ শেষ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লেগে যায়। চলতি বছরের মার্চে ছবিটি সার্টিফিকেশন সনদ লাভ করে।
মুক্তির আগে গত মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে সিনেমাটির একটি বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাচক চরিত্রে অভিনয় করা ফজলুর রহমান বাবু। উল্লেখযোগ্যভাবে, ছবিতে এই চরিত্রটির কোনো সংলাপ নেই। প্রদর্শনী শেষে বাবু মন্তব্য করেন, কিছু অভিনেতা চিত্রনাট্য পাওয়ার পর প্রথমেই সংলাপের সংখ্যা গোনেন। কিন্তু মঞ্চ থেকে আসা অভিনেতারা কখনোই সেটা করেন না। অভিনয় নিছক সংলাপ নির্ভর নয়, এটি অ্যাকশন ও প্রতিক্রিয়ার খেলা। তার কাছে চরিত্রটির মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কাস্টিং প্রসঙ্গে পরিচালক নূরুজ্জামান জানান, তার দর্শন খুবই সরল। কল্পনার চরিত্রের সঙ্গে যখন কোনো অভিনেতার দৈহিক গঠন ও অবয়ব মিলে যায়, তখনই তাকে নির্বাচন করেন। ‘মাস্তুল’-এর জন্য সবচেয়ে বেশি অডিশন নিতে হয়েছে সুকানি চরিত্রটির জন্য। অনেক পরিচিত মুখ এই চরিত্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও শেষ পর্যন্ত দীপক সুমনকে বেছে নেওয়া হয়। নির্মাতার ভাষায়, দীপক সুমনের কাজ অতুলনীয়।
নূরুজ্জামান আরও বলেন, তিনি যে ধরনের সিনেমা দেখতে চান, সেটাই বানাতে চান। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এমন সিনেমা দেখার দর্শক বাংলাদেশে রয়েছে এবং সেই দর্শকের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও এখনও তা বিপুল নয়।
বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার মতে, পুরো সিনেমাটি প্রামাণ্যচিত্রের মতো মনে হলেও এর অভ্যন্তরে অসাধারণ একটি আখ্যান রয়েছে। বিশেষ করে নদী ও বন্দরকেন্দ্রিক যে জীবনচিত্র উঠে এসেছে, তা অনেকের কাছেই সম্পূর্ণ অজানা এক জগৎ।
ছবিটিতে আরও অভিনয় করেছেন আমিনুর রহমান ও আরিফ হাসান। সিনেমাকার প্রযোজিত ‘মাস্তুল’-এর চিত্রধারণ করেছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান, শিল্পনির্দেশনা দিয়েছেন হুসনাইন লিঙ্কন, সংগীত পরিচালনা করেছেন চৈতন্য রাজবংশী এবং কাস্টিং ডিরেক্টর ছিলেন যুবরাজ শামীম। প্রচারণার গানটির সংগীতায়োজন করেছেন লাবিক কামাল গৌরব।
মুক্তির আগেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়েছে ছবিটি। ৪৭তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নিয়ে ‘মাস্তুল’ অর্জন করেছে ‘স্পেশাল মেনশন’ পুরস্কার।
নির্মাতা জানিয়েছেন, বর্তমানে ছবিটি ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মোট পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে। ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা শাখায় প্রতিদিন দুপুর ২টা ও সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দুটি শো চলছে। নারায়ণগঞ্জের স্টার সিনেপ্লেক্সেও প্রতিদিন দুটি করে প্রদর্শনী রয়েছে। এছাড়া যমুনা ব্লকবাস্টার, লায়ন সিনেমাস ও নারায়ণগঞ্জ সিনেস্কোপেও সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছে। একই দিনে পরিচালক এ আর মুকুল নেত্রবাদীর ‘বাপজান’ সিনেমাটিও মুক্তি পায়, যাতে অভিনয় করেছেন সাদিয়া মির্জা, সোহেল ও সরল হাসমত।



