বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা ও অপরাধ দমনের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে ‘কারাগারে অনুসন্ধান’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলা মোটর এলাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনের বাতিঘরে আয়োজিত বইটির প্রকাশনা উৎসবে ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি।

অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ‘কারাগারে অনুসন্ধান গ্রন্থ সুহৃদ সমাবেশ, ঢাকা’। সভাপতিত্ব করেন জাপানের এহিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর। বইটির লেখক গবেষক মো. খোসবর আলী। টানা ১৪ বছর ধরে দেশ-বিদেশের নানা গ্রন্থ ও কারাগারবিষয়ক প্রতিবেদন নিয়ে গবেষণা করে তিনি ৬০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। পুন্ড্র প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থা এখনো ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ রাষ্ট্রকাঠামোর শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে টিকে আছে। বইটি সেই ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তিনি উল্লেখ করেন, কারাগারগুলো এক বিচ্ছিন্ন ও অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি, নির্যাতন ও সুযোগ-সুবিধার কেনাবেচা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ বন্দীদের প্রতি অমানবিক আচরণের বিষয়টি বইটিতে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, অথচ রাজনৈতিক বন্দীদের তুলনায় তাদের ভোগান্তি কম গুরুত্ব পায়।

নারী বন্দীদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বইটির নারী বন্দীবিষয়ক অধ্যায় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বৈষম্য ও আধিপত্যের চিত্র তুলে ধরেছে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না; পরিস্থিতিই তাদের অপরাধী করে তোলে। তাই শুধু শাস্তির মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়, বরং সমাজকে সেই সব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সুরাহা করতে হবে যা মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান’ গান পরিবেশন করেন তাহসীনা মুস্তারী অবন্তী।

প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক থাকাকালীন কারাগার দেখার অভিজ্ঞতার আলোকে বইটির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন।

লেখক মো. খোসবর আলী বলেন, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের ঔপনিবেশিক আমলের কারাগারবিষয়ক একটি প্রবন্ধ পড়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। সেই প্রবন্ধই তাঁর গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি জানান, বাংলাদেশে এই বিষয়ভিত্তিক বই, গবেষণাপত্র ও দলিলের প্রাপ্যতা অত্যন্ত সীমিত। তাই তিনি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বই, গবেষণাপত্র, সরকারি নথি, জার্নাল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল সংগ্রহ করে প্রায় ১৪ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এই গ্রন্থ রচনা করেছেন।

খোসবর আলী আরও বলেন, এই গ্রন্থে প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারত থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক কারাব্যবস্থার বিকাশ, দণ্ডনীতি, কারা প্রশাসন, বন্দিজীবন, বন্দী শ্রম, বিচারিক নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও আন্দামানসহ বিভিন্ন দণ্ড-উপনিবেশের ইতিহাস গবেষণা ও তথ্যের আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল কারাগারকে শুধু শাস্তি প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও ইতিহাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা হিসেবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।

প্রধান আলোচক দেশ রূপান্তর পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, যে কাজ রাষ্ট্রের করা প্রয়োজন ছিল, রাষ্ট্র তা করেনি; খোসবর আলী সেটি করেছেন। আগামী দিনে যাঁরা কারাগার নিয়ে গবেষণা, সাংবাদিকতা বা মৌলিক কাজ করবেন, তাঁদের জন্য এই বই একটি আকর গ্রন্থ। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র যদি কারা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তাহলে এই বই রাষ্ট্রের কাজে লাগবে।

লেখক ও উন্নয়নকর্মী নিশাত সুলতানা বইয়ের নারীবিষয়ক অংশ বিশ্লেষণ করে ঔপনিবেশিক আমলে কারাগারে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও অবিচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সাংবাদিক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ বইটি প্রকাশের প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত জানান। শেষে তাহসীনা মুস্তারী অবন্তী ‘আমার দেশের মাটি’ গান পরিবেশন করেন।