দেশে চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক পিছিয়ে থাকার প্রেক্ষাপটে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। শনিবার সকালে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযোগী প্রযুক্তি’ শীর্ষক এই আয়োজনে বক্তারা বলেন, প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রায় সব যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হচ্ছে, যার ফলে দেশের লাখ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও কাঁচি থেকে শুরু করে মানুষের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য সব সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে—এটি মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। তিনি দেশের চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে প্রতিদিন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে; আপনারা দেশের জন্য কিছু করুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু করুন। নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী যেকোনো বিষয়ে প্রণোদনা দিতে ও সব ধরনের সহযোগিতা করতে অত্যন্ত আগ্রহী বলে উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা যদি একবার এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশের জন্য কী করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।’
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সিদ্দিকী-ই রব্বানী। তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে চান উল্লেখ করে সিদ্দিকী-ই রব্বানী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হলে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। উদ্ভাবকেরা যতক্ষণ না উদ্যোক্তা হচ্ছেন, ততক্ষণ তাঁদের প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি স্টার্টআপগুলো যেন ঘর থেকে শুরু করতে পারে সেই প্রস্তাব রেখে বলেন, কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়; সরকারি ব্যবস্থাপনা তাদের হয়রানি করার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কর আদায়কারীদের হয়রানি থেকে ছোট উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
সম্মেলনের সহসভাপতি অধ্যাপক তৌফিক হাসান তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দেশকে স্বনির্ভর হতে হবে; দেশীয় সমাধান থাকতে হবে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সোসাইটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চমৎকার সাফল্য অর্জন করলেও চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে অনেক পিছিয়ে; সরকারের উৎসাহ ও সমর্থন জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তি দ্রুত স্বাস্থ্যসেবাকে বদলে দিচ্ছে; সঠিকভাবে কাজে লাগালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হতে পারে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগতি সত্ত্বেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর লাখ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত; সমাধান কেবল আমদানিতে নয়, বরং চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও নীতিনির্ধারকদের নিবিড় সহযোগিতায় সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রযুক্তি গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম উল্লেখ করেন, চিকিৎসা খাতে বিশ্ববিদ্যালয় নানা ধরনের উদ্ভাবন করে যাচ্ছে; প্রকৃত একাডেমিক উদ্ভাবন তখনই সফল হয় যখন তা জাতীয় নীতিতে গ্রহণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত টেলিমেডিসিন সরঞ্জাম রাষ্ট্র গ্রহণ করলে গ্রামীণ গণ-স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা দেন যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বি এইচ ব্রাউন ও পাকিস্তান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েসনের মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল বাসিত। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকরাম হোসেন। এ সময় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কে এম তালহা নাহিয়ান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী মৃত্তিকা হোসেন ও মো. উজায়ের বিন রফিক। সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাইবিট লিমিটেড এবং রিলিভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি বাংলাদেশ।




