ফুটবল বিশ্বকাপে স্বৈরাচারী শাসনের তুলনায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সাফল্য অনেক বেশি—এমন তথ্য উঠে এসেছে এক সাম্প্রতিক গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রের লাগ্রাঞ্জ কলেজের অধ্যাপক জন টিউরেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯৩০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২টি বিশ্বকাপের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। পলিটি এবং ফ্রিডম হাউজের সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোকে গণতান্ত্রিক, আধা-গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়।

প্রথম দিকের বিশ্বকাপগুলোতে স্বৈরাচারী দেশগুলোর দাপট ছিল। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি নিজ দেশে আয়োজিত টুর্নামেন্টে হেরফের করে চ্যাম্পিয়ন করেন। একইভাবে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের দমননীতি ঢাকতে চেয়েছিল। তবে ১৯৬৬ সালের পর থেকে ছবি বদলে যায়। ওই বছর প্রথমবারের মতো দুটি গণতান্ত্রিক দেশ—ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি—ফাইনালে মুখোমুখি হয়। তারপর থেকে মাত্র দুটি স্বৈরাচারী দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে: ১৯৭০ সালে ব্রাজিল ও ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা। ১৯৮২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সব বিজয়ী দেশই ছিল গণতান্ত্রিক।

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৩০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ফাইনালে অংশ নেওয়া দলগুলোর ৭১.৪ শতাংশ ছিল গণতান্ত্রিক। স্বৈরাচারী দেশের অংশগ্রহণ ছিল ২০ শতাংশের কম। ফ্রিডম হাউজের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ফাইনালে অংশ নেওয়া ২৬টি দেশের মধ্যে ২৩টিই ছিল ‘মুক্ত’ দেশ, যা মোটের ৮৮ শতাংশ। একমাত্র আংশিক মুক্ত দেশ হিসেবে ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল এবং একমাত্র অমুক্ত দেশ হিসেবে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়।

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের বিস্তারের সঙ্গেও এই প্রবণতা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৩০ সালে বিশ্বের মাত্র ২১.৭ শতাংশ দেশ গণতান্ত্রিক ছিল, যেখানে স্বৈরাচারী দেশ ছিল ৪৪.৬ শতাংশ। ২০১৮ সালের মধ্যে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা বেড়ে ৬০ শতাংশে দাঁড়ায়, আর স্বৈরাচারী দেশ কমে ১২ শতাংশে নেমে আসে।

২০২৬ বিশ্বকাপের ৪৮টি অংশগ্রহণকারী দেশের মধ্যে ৪৩.১ শতাংশ ‘মুক্ত’ দেশ, যা ১৯৭৪ সালে ছিল ২৭ শতাংশ। অমুক্ত দেশের সংখ্যা ৪১.৪ শতাংশ থেকে কমে ২৬.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১১টি দেশই ‘মুক্ত’। শীর্ষ ১৯-এর মধ্যে মরক্কো ও ইকুয়েডর ছাড়া বাকি সবাই মুক্ত। অন্যদিকে সবচেয়ে নিম্ন র্যাঙ্কিংয়ের ১১টি দেশের অর্ধেকের বেশি অমুক্ত।

গবেষকরা বলছেন, স্বৈরাচারী দেশগুলো যখন খেলাকে প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মাঠে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জয় মুক্ত বিশ্বের জন্য একটি বিজয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। ফিফা প্রায়শই আয়োজক দেশের মানবাধিকার রেকর্ড উপেক্ষা করে, কিন্তু এই তথ্য প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রই বিশ্বকাপে সফলতার চাবিকাঠি।