প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে বিস্কুটের প্যাকেট ছিঁড়তে গিয়ে হঠাৎ সেটি হাত থেকে পড়ে গেল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বিস্কুটটি ওপরের দিকে না গিয়ে নিচের দিকেই পড়ল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মাধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বলের মধ্যে। এটি এমন এক মৌলিক শক্তি যা মহাবিশ্বের যেকোনো ভরযুক্ত বস্তুকে নিজের দিকে টানে। তবে পৃথিবীর সর্বত্র এই বলের মান সমান নয়, যা বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হয়।
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন ১৬৮৭ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফিলোসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা'-তে মহাকর্ষ সূত্র প্রকাশ করেন। এর আগে অনেকের ধারণা ছিল ভারী বস্তু হালকা বস্তুর চেয়ে দ্রুত পড়ে। কিন্তু গ্যালিলিও প্রমাণ করেন, বাতাসের বাধা না থাকলে ভর নির্বিশেষে সব বস্তু একই গতিতে নিচে পড়ে। বাতাসের প্রতিরোধই এখানে মূল ভূমিকা পালন করে।
মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভর ও ওজনের পার্থক্য বোঝা জরুরি। ভর হলো কোনো বস্তুতে কতটুকু পদার্থ আছে তার পরিমাপ, যা স্থানভেদে পরিবর্তন হয় না—এটি ধ্রুবক। অন্যদিকে ওজন নির্ভর করে মহাকর্ষ বলের ওপর। চাঁদে গিয়ে নভোচারীদের ভর একই থাকে, কিন্তু সেখানে মহাকর্ষ কম থাকায় তাদের ওজন পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ হয়ে যায়।
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মহাকর্ষের মান পরিবর্তনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, পৃথিবী পুরোপুরি গোলাকার নয়; নিরক্ষরেখায় ব্যাসার্ধ মেরু অঞ্চলের চেয়ে বেশি, ফলে সেখানে মহাকর্ষ কিছুটা কম। পৃথিবীর ঘূর্ণনজনিত কেন্দ্রবিমুখী বলও এই প্রভাবকে বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বেড়ে যায়, আর দূরত্বের সঙ্গে মহাকর্ষের সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক—যত দূরত্ব বাড়ে, বল তত কমে। তৃতীয়ত, মাটির গঠনও গুরুত্বপূর্ণ; কোনো অঞ্চলে ভারী খনিজ পদার্থ থাকলে সেখানে মাধ্যাকর্ষণ কিছুটা বেড়ে যায়। এসব কারণে বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু অঞ্চলে মানুষের ওজন প্রায় আধা শতাংশ বেশি হতে পারে।
মহাকর্ষ বলের কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এটি সর্বজনীন আকর্ষণ বল—মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে। বস্তুর ভর যত বেশি, আকর্ষণ বলও তত বেশি; আবার দূরত্ব বাড়লে বল কমে যায়। পাহাড়ে ওঠার সময় যে কষ্ট হয়, তার কারণও এই বল—পৃথিবীর টান নিচের দিকে কাজ করে। নদীতে স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানোর মতোই পরিশ্রম বেশি হয়। এই মহাকর্ষই গ্রহগুলোকে সূর্যের চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ধরে রাখে এবং উপগ্রহগুলোকে নিজ নিজ গ্রহের চারপাশে ঘুরতে সহায়তা করে। সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, ভারী বস্তু স্থানের বক্রতা সৃষ্টি করে, যা এই আকর্ষণের কারণ। খালি চোখে না বোঝা গেলেও, পৃথিবীর সর্বত্র মাধ্যাকর্ষণের মাত্রা যে সমান নয়—সেটাই এই আলোচনার মূল বার্তা।




