আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলে মানুষ ও বন্য হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও নামিবিয়ার গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই সংঘাত আগামী দশকগুলোতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভান প্যাট্রিকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় নামিবিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং সে দেশের পরিবেশ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে এমন ৩৮টি এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেন যে, ২০০৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, মানুষের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয়ত, কৃষি ও অন্যান্য কাজে জমির অতিরিক্ত ব্যবহার হয়েছে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির অভাব দেখা দিয়েছে। গবেষকরা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এই তিনটি কারণ অপরিবর্তিত থাকলে ২০৮৫ সালের মধ্যে সংঘাতের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ৩৩ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে।

নামিবিয়া, বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা ও জাম্বিয়ার কিছু অংশে গত দুই দশকে বনভূমি দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। মানুষের আগ্রাসী ভূমি ব্যবহারই সংঘাতের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাভানা হাতিরা এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের একটি মূল ভিত্তি। এই বিশাল প্রাণীদের উপর সাভানার অসংখ্য অন্যান্য প্রাণীর ভাগ্য নির্ভর করে। কিন্তু মানুষে তৈরি রাস্তা এবং বেড়া বন্য হাতিদের সরাসরি লোকালয়ে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে হাতিরা ফসলের ক্ষেত হানাদারি করছে, মানুষ আহত করছে এবং অবকাঠামো ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নামিবিয়ায় হাতির মাধ্যমে ফসলের ক্ষতি হওয়াই মানুষের সঙ্গে সংঘাতের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। এই অঞ্চলে কৃষিকাজ জীবনধারণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাতির মুখোমুখি হওয়ার কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা ট্রফি হান্টিং বা বন্য প্রাণী পর্যটনের স্থানীয় লাভের চেয়ে অনেক বেশি। নামিবিয়ার জাম্বেজি অঞ্চলে এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। এই আর্দ্র অঞ্চলের জমি কৃষিকাজের বিস্তারের জন্য খুবই আকর্ষণীয় এবং এলাকাটি হাতির প্রধান সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি যাতায়াতের পথ হিসেবেও কাজ করে।

গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ হাতি সুরক্ষিত রয়েছে। তবে কয়েক দশকের শিকারিদের হাত থেকে হাতির সংখ্যা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করলেও তাদের বাসস্থান সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য এটি মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে এবং অনেক সময় ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে বন্য হাতি হত্যার ঘটনাও ঘটে, যা হাতি সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় মানুষের সমর্থন কমিয়ে দিচ্ছে।

তবে গবেষকরা মনে করেন, ভূমি ব্যবহার যেহেতু প্রধান কারণ, তাই স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় হাতিদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছেড়ে দিলে এই ক্ষতি কমানো সম্ভব। এটি মানুষের জীবিকা এবং ঝুঁকিতে থাকা এই প্রাণী—উভয়ের সহাবস্থান নিশ্চিত করবে বলেই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট।