যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান সংশয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে একটি কলেজ ডিগ্রি অর্জনের খরচ বহু পরিবারের জন্য প্রায় বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ১৯৮০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে গড় টিউশন ফি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। তবে আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উচ্চশিক্ষার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ থমাস অ্যাডামের গবেষণা এই ধারণাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

অধ্যাপক অ্যাডাম ১৮৪০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকান কলেজগুলোর টিউশন ফির বিবর্তন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃতপক্ষে ১৯৯০ সালের পর টিউশন বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু পরিবারের মধ্যম আয়ের প্রবৃদ্ধি সেই হারে না বাড়ায় সমস্যা প্রকট হয়েছে। ১৯৮০ সালে একটি কলেজের টিউশন বাবদ পরিবারের মধ্যম আয়ের মাত্র ১৪% খরচ হতো; ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩%।

ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ১৮৪০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত টিউশন ফি মূলত স্থির ছিল। সে সময় অনেক কলেজই বিনামূল্যে শিক্ষা দিত। ১৯১০ সালে প্রায় ২০% প্রতিষ্ঠান—স্ট্যানফোর্ড, হাওয়ার্ড, ওরেগন স্টেটসহ—কোনো টিউশন নিত না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ বহন করত তাদের ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তা বা সমাজ। কিন্তু বিংশ শতকের শুরুতে ছাত্রদের পেশাগত লক্ষ্য বদলায়। ধনী পরিবারের সন্তানেরা আইন, চিকিৎসা ইত্যাদি উচ্চ আয়ের পেশার জন্য কলেজে ভর্তি হতে থাকে। জন ডি. রকফেলার জুনিয়রের মতো প্রভাবশালী দাতা যুক্তি দেন যে, এই শিক্ষার্থীরাই শিক্ষার মূল্য দিতে সক্ষম এবং তাদের কাছ থেকে টিউশনি আদায় করা উচিত।

১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে টিউশন ফি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই বৃদ্ধির পেছনে আর্থিক প্রয়োজনীয়তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং উদ্দেশ্য ছিল ধনী পরিবারের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায় করা। ফলে টিউশন ফি প্রতি দশকে প্রায় ১৫০% থেকে ১৯০% হারে বাড়তে থাকে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে এই হার দাঁড়ায় দশকপ্রতি প্রায় ২২০%। সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ঘটে ১৯৮০-এর দশকে—এক দশকেই টিউশন ফি বেড়েছে ২৪১%। গড় টিউশন ২,৬৮৬ ডলার থেকে বেড়ে ৬,৪৬৭ ডলারে পৌঁছে।

১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত পরিবারের মধ্যম আয়ও টিউশনের সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছিল, ফলে খরচের বোঝা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তারপর আয়ের প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে কমে যায়। ১৯৮০-এর দশকে যেখানে টিউশন বেড়েছিল ২৪১%, সেখানে পরিবারের আয় বেড়েছিল মাত্র ১৫৩%। পরবর্তী দশকগুলোতে টিউশনের বৃদ্ধির হার কিছুটা কমলেও (১৯৯০-এর দশকে ১৮০%, ২০১০-এর দশকে ১৪২%), আয়ের প্রবৃদ্ধি আরও কমে যায়। এর ফলেই কলেজের ব্যয় পরিবারের আয়ের ৪৩% হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উচ্চ টিউশনের চাপে পড়ে ২০২৫ সালে অর্ধেকের বেশি স্নাতক শিক্ষার্থীই ছাত্র ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৫%। ছাত্র ঋণের মোট পরিমাণ ২০০৬ সালে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই ঋণের বোঝা স্নাতকদের বাড়ি বা গাড়ি কেনা, বিয়ে করা, এমনকি সন্তান নেওয়ার মতো জীবনসিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করছে। ২০২৪ সালে ছাত্র ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয় ঋণগ্রহীতার বার্ষিক আয়ের ৭.১%, যা ২০০৬ সালে ছিল ৪.৬%।

টিউশন ফি বরফীকরণ বা ছাত্র ঋণ মওকুফের মতো নানা নীতি প্রস্তাব থাকলেও অধ্যাপক অ্যাডামের গবেষণা পরামর্শ দেয়, মূল সমস্যা টিউশনের অত্যধিক বৃদ্ধি নয় বরং পারিবারিক আয়ের স্থবিরতা। তাই শুধু শিক্ষাখাতে নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব।