ভারতের শীর্ষ আদালত ভোজশালা–কামাল মওলা মসজিদ ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধের নিষ্পত্তির পথে আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ মুসলিমপক্ষের করা আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে। একইসঙ্গে এই মামলাটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করে তারা উভয় সম্প্রদায়কে ধৈর্য বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, তারা দ্রুততম সময়ে নিয়মিত শুনানির মাধ্যমে বিরোধ মেটাতে চায়।
তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ভোজশালা–কামাল মওলা মসজিদের ভেতরে জুমার নামাজ আদায়ের অনুমতি চেয়ে যে অন্তর্বর্তী আবেদন করা হয়েছিল, তা খারিজ করে দিয়েছে আদালত। পরিবর্তে মধ্যপ্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মসজিদের পাশে একটি উন্মুক্ত স্থান বরাদ্দ করতে, যেখানে মুসলিমরা প্রত্যেক শুক্রবার বেলা ১টা থেকে ৩টার মধ্যে নামাজ পড়তে পারবেন। পাশাপাশি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (এএসআই) কে আদালতের অনুমতি ছাড়া ওই কমপ্লেক্সে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিরোধের সূত্রপাত গত মে মাসে, যখন মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট একটি রায়ে ভোজশালা–কামাল মওলা মসজিদটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করে। সেই রায়ের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছিলেন মুসলিমপক্ষের আইনজীবীরা। তাদের বক্তব্য ছিল, হাইকোর্ট রায় দেওয়ার সময় ভোজশালা প্রাঙ্গণে মুসলিমদের নামাজের অধিকার এবং ২০০৩ সালের এএসআই আদেশকে যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। সংশ্লিষ্ট আদেশটি অনুযায়ী হিন্দু সম্প্রদায় মঙ্গলবার এবং মুসলিম সম্প্রদায় শুক্রবার সেখানে ধর্মীয় আচার পালন করে আসছিলেন।
মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট অবশ্য গত বছরের মার্চে এএসআইকে বৈজ্ঞানিক জরিপ চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। ওই জরিপ ৯৮ দিন ধরে চলে এবং দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয় প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা। তাদের দাবি, বর্তমান মসজিদটি নির্মাণের আগে ধার রাজবংশের আমলে একটি বড় স্থাপনা ছিল ওই জায়গায়। মসজিটির গঠনে মন্দিরের বিভিন্ন স্থাপত্য উপাদান পুনঃব্যবহার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। হিন্দুপক্ষ এই জরিপকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে দাবি করে, সেখানে প্রাপ্ত মুদ্রা, ভাস্কর্য ও শিলালিপি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে স্থানটি মূলত একটি মন্দির।
অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দ ধরে এই স্থানটিকে কামাল মওলা মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে বলে দাবি করে আসছে। তারা সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দেয় যে এএসআইয়ের জরিপ প্রতিবেদন সম্পূর্ণ পক্ষপাতদুষ্ট এবং তা শুধু হিন্দু আবেদনকারীদের স্বপক্ষে সমর্থন জোগানোর জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। আদালত এখন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে এই জটিল ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিরোধের নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করবে বলে জানিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে মসজিদের অভ্যন্তরে নামাজের অনুমতি না দিলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার জন্য একটি বিকল্প পথ বের করার চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে এএসআইকে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন না করতে বলে আদালত বর্তমান অবস্থা যাতে অপরিবর্তিত থাকে, তা নিশ্চিত করছে।


