চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রায় দুই দিন ধরে পড়ে ছিল এক কিশোরের মৃতদেহ, অথচ এ সময়টুকুতে ছেলেটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার পরিবার। এরই মধ্যে অপহরণের অজুহাতে পরিবারের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা আদায় করে নেয় একটি প্রতারক চক্র। শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের প্রকাশিত একটি ছবি দেখে পরিবার নিশ্চিত হয় যে, মর্গে রাখা লাশটি তাদের নিখোঁজ সন্তানেরই।

নিহত কিশোরের নাম সায়েদ মুনিফ আহমেদ শান (১৫)। সে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকার চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাড়ি সন্দীপের মগধারা এলাকায়, পিতা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। গত শনিবার হালিশহর চুনা ফ্যাক্টরি এলাকার বাসা থেকে কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বের হয় শান। সেদিন রাতেই পতেঙ্গা সৈকত এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর হালিশহর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, এবং শানের চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, পাঁচ বন্ধু মিলে কোচিং শেষে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যায়। সেখানে তারা পানিতে নামলে ঢেউয়ের তোড়ে শান ভেসে যায়। ভয় পেয়ে দুই দিন ধরে বিষয়টি কাউকে জানায়নি তার সহপাঠীরা। পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. পারভেজ জানান, দুই দিন আগে অজ্ঞাত এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করে থানা-পুলিশ। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে লাশের ছবি প্রকাশ করা হয়। উদ্ধারের পর লাশটি মর্গে পাঠানো হয়। সোমবার সন্ধ্যার পর ফেসবুক পেজে ছবি দেখে পরিবার এবং হালিশহর থানার পক্ষ থেকে ওই কিশোরের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার কোচিংয়ে পরীক্ষা ছিল শানের, কিন্তু কোচিং শেষে বাসায় ফেরেনি সে। চারদিকে খোঁজাখুঁজির পরও তাকে না পেয়ে হালিশহর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পরদিন পরিবারের কাছে ফোন করে এক ব্যক্তি দাবি করে, শানকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাকে ফিরে পেতে টাকা দাবি করে। শানকে পেতে নগরের ষোলশহর এলাকায় আসতে বলা হয়। পরিবার পুলিশকে জানালে পুলিশ সেখানে যায়, কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা হলে শানের মামার বিকাশ নম্বর থেকে সেই নম্বরে ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। পরে জানা যায়, যে নম্বরে টাকা পাঠানো হয়েছে সেটি লোহাগাড়া উপজেলার কারও নম্বর।

নিহতের চাচা গোফরান উদ্দিনের অভিযোগ, দুই দিন ধরে তারা শানকে খুঁজলেও পুলিশ যে লাশ মর্গে পাঠিয়েছে সেটি যে শানের, এই খবর তাদের কেউ জানায়নি। দুই দিন ধরে মর্গে পড়ে ছিল তার ভাতিজার লাশ। অপহরণের কথা বলে টাকা নেওয়া চক্রটিকে পুলিশের তদন্ত করে বের করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি, দুই দিন আগে লাশ উদ্ধারের পরও সব থানায় কেন জানানো হলো না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। গোফরান উদ্দিন আরও জানান, শানের মামার বিকাশ নম্বর থেকে টাকা পাঠানো হয়েছে। প্রথমে ষোলশহর স্টেশনে আসতে বলা হলেও পুলিশ সেখানে গিয়ে কাউকে পায়নি। পরে আরেকটি নম্বরে টাকা পাঠানো হয়, যা লোহাগাড়ার এক ব্যক্তির নামে। এসব তথ্য পুলিশকে দেওয়া হয়েছে।

হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন বলেন, শনিবার শান চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গায় ঘুরতে গিয়েছিল এবং পানিতে ভেসে যায়। ভয় পাওয়ায় বন্ধুরা কাউকে কিছু জানায়নি। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। অপহরণের কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তাধীন রয়েছে। চার কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।