বাংলাদেশের আধুনিক ব্যান্ড সংগীতের ধারায় যাঁর লেখা ‘আজ যে শিশু’, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হৃদয় কাদামাটি’ কিংবা ‘যতীন স্যার র ক্লাসে’-র মতো গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, সেই গীতিকবি শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর আজ জন্মদি ন। ১৯৫৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে তাঁর জন্ম। পারিবারিকভাবে রাজনীতি ও সমাজসেবার আবহে বড় হলেও সাংস্কৃতিক পরিবেশই ছিল ত তার জীবনের প্রধান নিয়ামক।
তাঁর বাবা এ. এল. চৌধুরী ১৯৫৪ সালে যুক্ত ফ্রন্টের রাজনীতি করলেও পরবর্তী জীবনে জড়িয়ে পড়েন সমাজসেবায়। আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে বাবাই পারিবারিক ‘চৌধুরী’ পদবির বদলে ‘জঙ্গী’ নাম জুড়ে দেন। ষাট ও সত্তরের দশকে তাঁদের চট্টগ্রামের বাড়িতে প্রতি রোববার গানের আসর বসত। নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রধারা থেকে শ ই ররনহর। ধীরে ধীরে এই পরিমণ্ডলই তাঁকে সংগঠন, আড্ডা ও শিল্পীদের জগতে টেনে নেয়।
ছোটবেলায় পাঠশালায় নিয়মিত না গিয়ে সিনেমা হল ও পাবলিক লাইব্রেরিতে ঘোরেন। পরবর্তী সময়ে ‘মন্টুর পাঠশালা’ নামক নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর ভেতরের অস্থিরতা সৃজশীল অনুসন্ধানে রূপ নেয়। শিক্ষাজীবনে পা রেখে ১৯৭০ সালে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে মামলায় জড়িয়ে পড়েন। মাশাল আইন জারি হলে কারাদণ্ডের হুলিয়া এড়াতে ঢাকায় পালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স কম থাকায় প্রশিক্ষণে সুযোগ না পেলেও বার্তাবাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সংগঠন ‘সূচনা’র মাধ্যমে তাঁর সাংস্কৃতিক তৎপরতা নতুন গতি পায়। এ ইমঞ্চেই ‘সুরেলা’ নাম নিয়ে প্রথম প্রকাশ্যে অ্যাকর্ডিয়ন বাজান মমতাজুল হক লুলু ও সাজেদুল আলম, যা পরবর্তী সময়ে ‘সোলস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জঙ্গী তখনকার দিনে কুমার বিশ্বজিৎ, নকীব খান, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু ও জেমসের মতো তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বড় ভাইয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সৈকতচারী’ সংগঠনটি লোকজ সংস্কৃতি ও আধুনিক গানের মেলবন্ধন ঘটায়। ১৯৭৮ সালে ডিসি হিলে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের গোড়াপত্তনে এই সংগঠনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এ সময়েই আঞ্চলিক ভাষায় একটি ও নাগরিক ধারায় আরেকটি গান লিখে তিনি গীতিকবিতাযাত্রার সূচনা করেন।
আইয়ুব বাচ্চুকে বাংলা গানে আনার পেছনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাশ্চাত্য ধারায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা বাচ্চুকে জঙ্গীই লিখে দেন ‘হারানো বিকেলের গল্প বলি’—এটিই ছিল বাচ্চুর প্রথম বাংলায় সুর। পরবর্তী সময়ে সোলসের দ্বিতীয় অ্যালবামের ‘প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত’ গানটি দিয়েও তিনি বাচ্চুর সুরকার-সত্তাকে পরিণত করেন। পিলু খানের সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশও ঘটে জঙ্গীরই লেখা ‘আজ যে শিশু’ দিয়ে।
আশির দশকের মধ্যভাগে ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার পর অ্যাডফার্ম গড়ার পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রোডের ব্লুনাইল হোটেলের কফি টেবিলজেন্দ্রি সাংস্কৃতিক আড্ডার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন তিনি। নাসিম আলী খানের অনুরোধে সেখানেই লেখা হয় ‘যতীন স্যারের ক্লাসে’র মতো অমর গান। পার্থ বড়ুয়া ও ফয়সলের মতো শিল্পীদের প্রথম হিট গানের উত্থানও এই ব্লুনাইলের আড্ডা ঘিরে।
তাঁর লেখা ‘আজ যে শিশু’ গানটির জন্ম শীতের রাতে রেলস্টেশনে পড়ে থাকা শিশুদের দৃশ্য থেকে। রেনেসাঁ ব্যান্ডের কণ্ঠে এটি পরবর্তীতে প্রতিবাদী আয়োজনের ভাষায় পরিণত হয়। অন্যদিকে ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ নামটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে মাইক্রোবাসে লেখা শুরু হয়ে ব্লুনাইলে শেষ হয়। সোলসের পর আইয়ুব বাচ্চু এটি নিজের দল এলআরবির প্রথম অ্যালবামের সূচনাসংগীত হিসেবে গ্রহণ করেন।
তিনি কখনোই গানের সংখ্যা হিসাব রাখেননি, বরং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকাকেই বড় সম্পদ বলে মনে করন। কোরোনা মহামারির পর তিনি গীতিকবি সংঘ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে গীতিকবীদের স্বীকৃতি ও সম্মানের বিষয়টি সামনে আনেন। ব্যবসা, শিক্ষকতা, কফিশপ, সাংগঠনিক সভা সবকিছু পেরিয়ে তিনি যে শেষপর্যন্ত গানেই ফিরেছেন, তাঁর জীবন ও কর্মপ্রমাণ করে বাংলা গান একই সময়ে কালের সাক্ষী ও সাংস্কৃতিক দলিল।



