চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও যমুনা অয়েল পিএলসির মধ্যে ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিটুমিন বিলের জের এখনো মেটেনি। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চট্টগ্রাম সফর উপলক্ষে নগরের রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য এই বিটুমিন সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে সেই টাকা পরিশোধ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চিঠি-চালাচালি চলছে।

গত ২১ জুলাই আবারও সিটি করপোরেশনকে বকেয়া পরিশোধের চিঠি দিয়েছে যমুনা অয়েল পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দফায় মোট ১ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন বিটুমিন সরবরাহ করা হয়। প্রতি টনের দাম ছিল ৫ হাজার ৪০০ টাকা। সেই অনুযায়ী মোট বিল দাঁড়ায় ৫৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত এই টাকা পরিশোধ করেনি চসিক।

যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, ২০২২, ২০২৪ এবং ২০২৬ সালে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বকেয়া পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বারবার নিরীক্ষা আপত্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-কেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। দুই মন্ত্রণালয় ও বিপিসি বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। বিপিসি, চসিক ও যমুনা অয়েলের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সর্বশেষ সভা করেও কোনো সমাধান বের হয়নি।

অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন দাবি করছে, এটি কোনো ক্রয় নয়, বরং অনুদান। ১৯৮৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ সেকান্দর হোসেন মিঞা যমুনা অয়েলকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, পৌর করপোরেশনের তহবিলস্বল্পতার কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এরশাদ চট্টগ্রাম সফরের সময় জরুরি রাস্তা মেরামতের জন্য দুই কোটি টাকা ও যমুনা অয়েল থেকে ৬০ লাখ টাকার বিটুমিন অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় এই বিটুমিন দিয়ে রাস্তার উন্নয়নের কাজ শেষ হয় বলে চসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী বলেন, “১৯৮৪ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সফর উপলক্ষে যমুনা অয়েল অনুদান হিসেবে বিটুমিন দিয়েছিল। সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে তা-ই লেখা আছে। এখন অনুদান হিসেবে পাওয়া বিটুমিনের জন্য কীভাবে টাকা পরিশোধ করব? এই বকেয়া পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই।”

যমুনা অয়েল পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মোহাম্মদ হাসান ইমাম অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশন যদি অনুদানের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারত, তাহলে বিষয়টি মিটমাট হয়ে যেত। কিন্তু তারা তা দেখাতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা কাগজপত্র অনুযায়ী এটি মূল্যছাড় দিয়ে সরবরাহ করা পণ্য।”

সচেতন নাগরিক কমিটি-টিআইবির চট্টগ্রামের সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তিনি বলেন, “তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৌখিক নির্দেশে নগরের রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য এই বিটুমিন সরবরাহ করেছিল যমুনা অয়েল। স্বৈরাচারী সরকারের সময় যা হয়, এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান মৌখিক নির্দেশ দিলেও কোনো লিখিত নির্দেশনা ছিল না। ফলে যমুনা অয়েল মনে করেছে এটি বিক্রি করা পণ্য, আর চসিক মনে করেছে অনুদান।”

তিনি আরও বলেন, “পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রতিষ্ঠানের এই ঠান্ডা লড়াই চলছে। বারবার নিরীক্ষা আপত্তি উঠছে। বর্তমানে যমুনা অয়েল লাভজনক প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। তাই যমুনা অয়েল এই বকেয়া মওকুফ করে দিতে পারে। অবশ্য দুই মন্ত্রণালয়কে এ উদ্যোগ নিতে হবে। এটি সহজে সমাধানযোগ্য বিষয়, তারপরও হচ্ছে না।”

১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে চসিক প্রতি অর্থবছরে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার বিটুমিন কেনে। সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু ৪২ বছর আগের ৫৭ লাখ টাকার বিল এখনও মেটানো সম্ভব হয়নি।