খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার বহুতল নতুন ভবন নির্মাণ শুরুর পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি, যার ফলে প্রচণ্ড রোগীর চাপে পুরাতন স্থাপনায় স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শয্যার তীব্র সঙ্কট দেখা দেওয়ায় হাসপাতালের বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন ভর্তি হওয়া অনেক রোগী।
রাজধানী থেকে দূরে অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলা ছাড়াও প্রতিবেশী রাঙ্গামাটির লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলার মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভরসাস্থল। প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ২,০০০ জন বহির্বিভাগীয় রোগী সেবা নিতে আসেন এখানে। রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, মূলত ১০০ শয্যা সক্ষমতার ওই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩০ জনে, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি।
অতিরিক্ত রোগীর ভিড়ে জাইগার অপ্রতুলতা চিকিৎসক ও নার্সদের কাজে যেমন বিঘ্ন সৃষ্টি করছে, তেমনি চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে রোগি ও তাদের স্বজনদের। পানছড়ি উপজেলার বাসিন্দা অতুল চাকমা তার বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু একটি শয্যা না পেয়ে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা করাতে বাধ্য হয়েছেন। একইভাবে দীঘিনালা থেকে আসা সালমা আক্তার তার শ্বাসকষ্টে ভোগা মেয়েকে চার দিন আগে ভর্তি করে বারান্দার মেঝেতেই সময় কাটছেন। গাইনি ওয়ার্ডেও একই চিত্র, যেখানে মনোয়ারা বেগম তার মেয়েকে ভর্তি করিয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিতে বাধ্য হওয়ার পাশাপাশি লোকজনের ক্রমাগত যাতায়াতের কারণে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
নতুন ভবনের কাজ বিলম্বের অভিঘাতে শুধু শয্যা সংকটই নয়, বরং জটিল ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা শুরুতেও বাধা সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রিপল বাপ্পী জানান, ভবন প্রস্তুত না হওয়ার ফলে আবশ্যকীয় জনবল নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি, যার দরুন পরিপূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা প্রদানে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ডায়াগনস্টিক সুবিধাদি সহ বেশ কিছু সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তার মতে, নতুন ভবন চালু হলে জনবল বাড়িয়ে সেবার বিস্তৃতি ঘটানো সম্ভব হবে।
গণপূর্ত বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই নির্মাণ পরিকল্পনার বরাত পায় স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজ। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কাজ আরম্ভ হয় এবং ২০২৪ সালে এটি সমাপ্তির কথা থাকলেও, এখন পর্যন্ত ভবনটি হস্তান্তর-উপযোগী হতে পারেনি। বর্তমানে মোট কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানান গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার দে। তিনি উল্লেখ করেন, কাজ ত্বরান্বিত করতে ঠিকাদারকে গত মাসে লিখিত আদেশ এবং নিয়মিত মৌখিক তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনায় গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে নবম তলা পর্যন্ত নতুন ভবনটিতে জরুরি বিভাগ, উন্নত প্যাথলজি ও রেডিওলজি ডায়াগনস্টিক সুবিধা (এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআইসহ), অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, ১০ শয্যার আইসিইউ, ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট, ২০ শয্যার আইসোলেশন কক্ষ ও কেবিনসহ সমস্ত আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রতন খীসা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, নতুন ভবনটি তৈরি না থাকার কারণে আইসিইউ এবং কিডনি ডায়ালাইসিসের মত অপরিহার্য সেবাগুলো এখনও আরম্ভ করা যায়নি। এমতাবস্থায়, বহিরাগত অধিক রোগীর চাপ সামলাতে নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একাধিকবার পত্রালাপ করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।



