দেশের টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার খাতের পৃথক নীতিমালা এবং একাধিক বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রিপল প্লে প্রযুক্তির পূর্ণ সুবিধা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলেই ফাইবার টু দ্য হোম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক জিপিওএন প্রযুক্তিনির্ভর এবং একই অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট, আইপিটিভি ও ভিওআইপি সেবা সরবরাহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা এই মডেলটি একটি একীভূত অবকাঠামোতে তিনটি সেবা প্রদান করে, যা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কমিয়ে আনে।

প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি থাকলেও ট্রিপল প্লে বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লাইসেন্সিং কাঠামো, সম্প্রচার নীতিমালা এবং কনটেন্ট অধিকার সংক্রান্ত জটিলতা। বর্তমানে সম্প্রচার, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবা পৃথক পৃথক খাত হিসেবে পরিচালিত হওয়ায় নীতিগত সমন্বয়ের অভাবে পূর্ণাঙ্গ ট্রিপল প্লে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দেশে বর্তমানে আনুমানিক দেড় কোটি ব্রডব্যান্ড গ্রাহক রয়েছে, যার প্রকৃত ব্যবহারকারী সংখ্যা আড়াই থেকে তিন কোটি। ট্রিপল প্লে প্রযুক্তি চালু হলে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এই বিশাল দর্শকগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি পৌঁছাতে পারবে। এতে চ্যানেল নম্বর নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতার সমাধান সম্ভব, কারণ দর্শক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাম দেখে চ্যানেল নির্বাচন করতে পারবেন। একই সঙ্গে টিআরপি পরিমাপ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা আনা সম্ভব হবে, যা বিজ্ঞাপনদাতা ও চ্যানেল উভয়ের জন্যই উপকারী। দেশীয় কনটেন্টের মান উন্নয়নের মাধ্যমে ভারতীয় চ্যানেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও সহজ হবে।

শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক বাজারেও ট্রিপল প্লে প্রযুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাভাষী মানুষের কাছে আইপি স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে দেশীয় চ্যানেল ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিকাশের জন্য ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে আইএসপি ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, যেখানে ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে ওটিটি সাবস্ক্রিপশন যুক্ত করা হচ্ছে বা আইএসপিগুলো নিজস্ব ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা চালু করছে।

সব মিলিয়ে ট্রিপল প্লে শুধু একটি প্রযুক্তিগত আপগ্রেড নয়; বরং টেলিভিশন শিল্পের পরবর্তী বিবর্তনের চাবিকাঠি। এই বিবর্তনে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল সম্প্রচার ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। পুরোনো লাইসেন্সিং কাঠামো ও বিভক্ত নীতিমালা দ্রুত পরিবর্তন করে সমন্বিত নীতিমালার আওতায় ট্রিপল প্লে সেবা চালু করা জরুরি। লেখক মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি।