স্বাধীনতা দিবসের প্রেক্ষাপটে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে দেশব্যাপী আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোতে সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। লখনউয়ের জয়প্রকাশ নারায়ণ সর্বোদয় বালিকা বিদ্যালয়ের ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কয়েক শত শিক্ষার্থী সোমবার বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তাদের প্রধান দাবি, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ইতিহাসের শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং অবিলম্বে শিক্ষক নিয়োগ করা হোক। সিজেপির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি শম্ভাজিনগরে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশের নামে আত্মপ্রচারের হোর্ডিং দিয়ে প্রতিটি রাস্তা ছেয়ে গেছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই অর্থ অপচয় না করে সরকারি স্কুলের অবকাঠামো মেরামত ও শিক্ষক নিয়োগে খরচ করা উচিত ছিল না কি? এই আন্দোলনই এখন তেলাপোকারা বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জেন-জিদের এই আন্দোলন ঠেকাতে বিজেপি শাসিত রাজস্থান সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ, ছবি তোলা, ভিডিও করা কিংবা স্কুল নিয়ে প্রচার করা নিষিদ্ধ। সরকারের দাবি, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত পরিসর রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। তবে সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেছেন, স্কুল বন্ধ না করে রাজ্য সরকারের উচিত স্কুল মেরামতের দিকে নজর দেওয়া। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে স্কুল পড়ুয়ারাই তাদের দুরবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে জনমত গঠন করবে।
শুধু রাজস্থান নয়, ঝাড়খণ্ডেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ইন্ডিয়া জোট সরকার নতি স্বীকার করেছে। সেখানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিন সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলছিল। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকে চিঠি লিখে তাদের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেন। যন্তর মন্তরের সেই আন্দোলনের ঢেউ এখন রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের ওপরও। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল একাডেমি অব লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের (নালসার) সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাকে। কিন্তু স্নাতক ও শিক্ষকদের একাংশের আপত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সমাবর্তনে যাবেন না। সোমবার তিনি জানান, আমন্ত্রণপত্রই তিনি গ্রহণ করেননি। এর আগে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে চিঠি লিখে বলেছিল, যিনি পড়ুয়াদের ওপর অত্যাচারের ভিডিও দেখতে চাননি, সময় নেই বলে মামলা শুনতে চাননি, তাঁর হাত থেকে তারা ডিগ্রি নেবে না। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান বিজেপি সাংসদ মননকুমার মিশ্র প্রথমে হুমকি দিয়েছিলেন যে নালসারের ২০২৬ সালের স্নাতকদের নাম নথিভুক্ত করা হবে না। কিন্তু সিজেপি নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে চার ঘণ্টার মধ্যে তিনি নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন এবং ১৮ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে চিঠি লেখেন। বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকেরাও নালসারের শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ঘটনার রেশ ধরে মহারাষ্ট্রের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের (টিস) বার্ষিক সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও পরে সমাবর্তনের দিন বদলে ২২ আগস্ট করা হয় এবং প্রধান অতিথি হিসেবে সি এস প্রমেশকে নির্বাচিত করা হয়। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র বিক্ষোভ এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দটি ব্যবহার করে যুব সম্প্রদায়কে এই ধরনের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এই শব্দের ব্যাখ্যা তিনি না দিলেও কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতির মতো বিরোধী নেতারা প্রকাশ্যে নিজেদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে ঘোষণা করেছেন। সিজেপি মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী মূলত তেলাপোকাদেরই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্স হ্যান্ডলে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে প্রশ্ন করার জন্য নকশাল বলাটা ঔদ্ধত্য। তিনি আরও লেখেন, ‘শুনুন, দিমাগি নকশাল বলুন বা অন্য কিছু, তাতে আর কাজ হবে না। ঘণ্টা বেজে গেছে। সবাই জেগে গেছে।’ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ও তেলাপোকাদের কর্মসূচি ধীরে ধীরে বিজেপি বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে।




