ঈদুল আজহার কয়েক সপ্তাহ পরের কথা। রাজধানীর একটি মাল্টিপ্লেক্সে কর্মদিবসের দুপুরে একটি বাংলা সিনেমার তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। শো শুরুর পর হলে গিয়ে দেখা গেল দর্শক মাত্র পাঁচজন। অথচ কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে বোঝা গেল, দর্শকদের বড় একটি অংশ এসেছেন ‘মাইকেল’ দেখতে—মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক, যার মুক্তির নবম সপ্তাহ চলছে তখন। এই দৃশ্যই যেন চলতি বছরের বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে দেয়—দেশের দর্শক সিনেমা হলে যাচ্ছেন, কিন্তু বাংলা ছবি দেখতে নয়।

চলতি বছর সারা বিশ্বের প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফিরে এসেছে লক্ষণীয় মাত্রায়। ‘মাইকেল’ ছাড়াও ২০২৬ সালে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে আরও চারটি সিনেমা। হলিউডের এই সাফল্যের ধারা বাংলাদেশের বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে দেশি সিনেমার চিত্র একদমই ভিন্ন। তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছাড়া এ বছর তেমন কোনো দেশি ছবিই বক্স অফিসে সাড়া ফেলতে পারেনি।

মহামারির পর হলিউডের বক্স অফিস ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেও ২০২৬ সালটি যেন সেই ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ বলছে, বছরের প্রথম সাত মাসের হিসাবে এটি মহামারির পর সবচেয়ে সফল বক্স অফিস বছর হতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রে। বছরের শুরুতেই ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ৬৮৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে চমক দেখায়। এপ্রিলে ‘মাইকেল’ এক বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে জায়গা করে নেয়। মে মাসে মাত্র এক মিলিয়ন ডলারের হরর ছবি ‘অবসেশন’ আয় করে ৪৭৫ মিলিয়ন ডলার। এরপর ‘ব্যাকরুমস’ ও ‘দ্য অডিসি’ প্রমাণ করে যে শুধু পুরোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়, নতুন গল্পও দর্শক টানতে পারে।

আগস্টের শুরুতেই ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ যেন পুরো শিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। টম হল্যান্ড অভিনীত এই ছবিটি এখন পর্যন্ত ১ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ছবিটি আইম্যাক্স বা প্রিমিয়াম ফরম্যাটের ওপর নির্ভর করেনি; সাধারণ প্রদর্শনীতেও দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।

চলতি বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২০ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। তবে ২০১৯ সালের একই সময়ে আয় ছিল ৭০০ কোটি ডলারের বেশি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ৩০ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাগৃহে প্রায় ৪৭ কোটি ৯ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছে, যেখানে ২০১৯ সালের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৭৪ কোটি ৭৩ লাখ। অর্থাৎ দর্শকসংখ্যা এখনও আগের জায়গায় আসেনি। তবে যারা যাচ্ছেন, তারা বেশি দামের টিকিট কিনছেন, বিশেষ করে আইম্যাক্স ও প্রিমিয়াম ফরম্যাটে। এ কারণেই মোট আয় দ্রুত বাড়ছে।

হলিউডের এক শীর্ষ প্রেক্ষাগৃহ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা সবাই অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছি।’ ফ্যানড্যাঙ্গোর বিশ্লেষক শন রবিনস ভ্যারাইটিকে বলেন, ‘চলতি বছরের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির তালিকায় বৈচিত্র্য থাকায় নানা ধরনের দর্শককে হলে টানা সম্ভব হয়েছে। অ্যাকশন, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, পারিবারিক বিনোদন, মৌলিক গল্প—সব মিলিয়ে বছরটি ভারসাম্যপূর্ণ।’ তবে বছরের বাকি সময়টা সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগস্ট ও শরতে মুক্তির তালিকা তুলনামূলক দুর্বল। বছরের শেষ দিকে ‘ডিউন: পার্ট থ্রি’, ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ আর ‘জুমানজি: ওপেন ওয়ার্ল্ড’ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

বাংলাদেশেও হলিউডের এই সাফল্যের ছোঁয়া লেগেছে। ‘মাইকেল’, ‘দ্য অডিসি’, ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ দেশের প্রেক্ষাগৃহে দারুণ ব্যবসা করেছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, দেশে চলতি বছর হলিউড সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে এই তিনটি ছবি। অন্যদিকে দেশি সিনেমার মধ্যে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সবচেয়ে ভালো করেছে, যার টিকিট বিক্রি হয়েছে ১৭ কোটি টাকার বেশি।

কেন দর্শক বাংলা সিনেমা দেখছেন না? এই প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক তানিম নূর মনে করেন, সংকটটি সাময়িক। তাঁর ভাষ্যে, ‘অনেক ভালো পরিচালক আছেন, যাঁরা সিনেমা বানাচ্ছেন না কিন্তু প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমার ধারণা, এই সংকট কেটে যাবে। আমাদের অনেক প্রতিভাবান পরিচালক আছেন, আমি অন্তত দশজনের নাম বলতে পারব; যাঁদের ব্যবসাসফল সিনেমা বানানোর সক্ষমতা আছে।’

তবে সমালোচক শাকিব চৌধুরী এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, দেশি সিনেমার ব্যর্থতার জন্য দায়ী নির্মাতারা। তিনি বলেন, ‘হলিউডের যে সিনেমাগুলো ভালো ব্যবসা করেছে, তারা দর্শক চাহিদা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। আমাদের পরিচালকেরা জাস্ট বোঝেন না এবং বুঝতে চানও না। “বনলতা এক্সপ্রেস” ছাড়া অনেক প্রমিজিং ছবি ছিল, যেমন “প্রেশার ককার”। কিন্তু “রকস্টার”–এর মতো ছবির অসাধারণ মেকিং থাকলেও গল্প এত বাজে যে দর্শক বুঝিয়ে দিয়েছে, গল্প ভালো না হলে আমরা দেখব না।’

শাকিব চৌধুরী আরও বলেন, ‘পরিচালকেরা হয় অতি আত্মবিশ্বাসী, না হয় খুবই লেজি। তাঁরা প্রতিভাবান কিন্তু হোমওয়ার্ক করেন না। হলে গিয়ে দর্শক কী দেখতে চান, সেটা নিয়ে একেবারেই ভাবেন না।’ ঈদকেন্দ্রিক মুক্তির প্রবণতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘“আয়নাবাজি”, “ঢাকা অ্যাটাক”, “হাওয়া” ঈদের সময় মুক্তি পায়নি, তারপরও ব্যবসা করেছে; কারণ সিনেমাগুলো ভালো ছিল। সিনেমা ভালো হলে যখনই মুক্তি পাক দর্শক আসবে।’

স্টার সিনেপ্লেক্সের মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অনেকের অভিযোগ থাকে, তাদের সিনেমা হল পায় না। ঈদের সময় এতগুলো সিনেমা মুক্তি দিলে তো হল পেতে সমস্যা হবেই। প্রতি মাসেই সিনেমা আসুক, তখন আমাদের জন্যও সুবিধা হবে।’ চলতি বছরের শেষ তিন মাসে ‘আন্ধার’, ‘সোলজার’ ও ‘সুড়ঙ্গ ২’ মুক্তি পাওয়ার কথা। বড় তারকা আর আলোচিত পরিচালকের এই সিনেমাগুলো কি দর্শকখরা কাটাতে পারবে? সময়ই বলবে।