উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে শিল্পী মুর্তজা বশীরের ব্যক্তিগত ও শৈল্পিক সম্পর্ক ছিল নিবিড়। ১৯৬০-এর দশকে লাহোরে অবস্থানকালে এই বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়। সম্প্রতি মুর্তজা বশীরের জ্যেষ্ঠ কন্যা মুনীরা বশীর তাঁর বাবার লেখা সেই স্মৃতিকথা এবং ফয়েজের মেয়ে সালিমা হাশমির সঙ্গে ২০২৩ সালে ঢাকায় দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

মুর্তজা বশীরের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ১৯৫৮ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে প্রথম একক প্রদর্শনী শেষে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং কিছুদিন পর করাচি যান। সেখানে আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব দ্য মিডল ইস্টের তত্ত্বাবধানে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়। ১৯৬০ সালের জুনে লন্ডনে ওবেইদ জাইগিরদারের মাধ্যমে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তখনই ফয়েজ তাঁকে লাহোর আর্ট কাউন্সিলে প্রদর্শনীর প্রস্তাব দেন। ডিসেম্বর মাসে টেলিগ্রাম পেয়ে মুর্তজা বশীর ২৮ ডিসেম্বর লাহোরে পৌঁছান। জানুয়ারির ৮ তারিখে আর্ট কাউন্সিলে ওই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন ওস্তাদ আল্লা বক্স। প্রদর্শনীটি দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পায় এবং তিন দিন বাড়িয়ে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে।

প্রদর্শনীর পর ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সহযোগিতায় মুর্তজা বশীর লাহোর আর্ট কাউন্সিলে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার সুযোগ পান। সেখানে তিনি চিলেকোঠায় একটি ঘর পেয়েছিলেন ছবি আঁকার জন্য। কিছুদিন পর তিনি হঠাৎ করাচি চলে গেলে ফয়েজ তাঁকে ফিরিয়ে আনতে উদ্বুদ্ধ করেন। মুর্তজা বশীর লিখেছেন, ফয়েজ তাঁকে নিঃসঙ্গতা কাটাতে বন্ধুত্বের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে নাসিম কাজি পদ ছেড়ে দিলে তিনি আবার ওই পদে ফিরে যান। ১৯৬২ সালে ঢাকায় ফিরে এসে ব�়ে করার সিদ্ধান্ত নিলে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ তাঁকে চিঠি লিখে শুভকামনা জানান এবং বরের কাছ থেকে বরের জন্য কাজের প্রস্তাবও দেন। ২৮ মে ব�়ের পরদিনই ফয়েজের কাছ থেকে অভিনন্দনবার্তা পান তিনি।

মুর্তজা বশীর আরও স্মরণ করেন, ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়ালচিত্রের কাজ করার সময় হোটেল পূর্বাণীতে ফয়েজের সঙ্গে দেখা হয়। তখন শিল্পী কামরুল হাসান দুজনের ছবি তোলেন। ফয়েজ তাঁকে ‘লোহু কা সুরাত’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ আঁকার প্রস্তাব দিলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। ১৯৬১ সালে ফয়েজের ‘পাথরের নিচে হাত’ কবিতার প্রচ্ছদ আঁকতেও পারেননি তিনি, যা পরবর্তীতে লেনিন পুরস্কার পাওয়ায় আফসোস থেকে যায়। ১৯৬৯ সালে হোটেল শাহবাগে শেষ দেখা হওয়ার সময় তিব্বতের আফটার শেভ লোশন ব্যবহার করতে দেখে ফয়েজের দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছিলেন মুর্তজা বশীর। সর্বশেষ ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে করাচিতে আর্ট কাউন্সিলের প্রদর্শনীর সময় ফয়েজের সঙ্গে দেখা হয়, যিনি তখন ক্যাটালগে ভূমিকা লিখেছিলেন। পরে রাওয়ালপিন্ডিতে প্রদর্শনী নিয়ে যোগাযোগ হলে ফয়েজ চিঠিতে সহায়তার আশ্বাস দেন।

এদিকে মুনীরা বশীর লিখেছেন, ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কন্যা সালিমা হাশমি ঢাকায় এসে তাঁর বাসায় দেখা করতে আসেন। আশফাকের মাধ্যমে এই সাক্ষাতের আয়োজন হয়েছিল। দরজায় দাঁড়িয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সালিমা হাশমি বাবার সেলফ পোর্ট্রেট দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ সময় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের লুভা নাহিদ চৌধুরী ও কবি নিজাম বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন। সালিমা হাশমি বারবার বাবার কথা স্মরণ করে কেঁদেছেন এবং বিদায়ের সময়ও তিনি আবেগে জড়িয়ে ধরেছিলেন মুনীরা বশীরকে। সালিমা হাশমি পাকিস্তানের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও শিল্প ইতিহাসবিদ, যিনি ন্যাশনাল কলেজ অব আর্টসের ডিন ছিলেন এবং পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের জন্য পরিচিত।