বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কেউ যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করে, তখন বিজ্ঞান সচেতন যে কেউই প্রতিবাদ জানাতে চাইবেন। কারণ এটি বারবার ভুল প্রমাণিত একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সকলের সামনে তার ভুল ধরে দেওয়া কি উচিত হবে, নাকি সম্পর্ক বাঁচাতে চুপ থাকাই শ্রেয়? সবসময় নিজেকে সঠিক প্রমাণের চেষ্টা করলে সামাজিক জীবনে বেশ বড় ধরনের মূল্য দিতে হয়। অনেকে এই স্বভাবের কারণে বন্ধুমহলে বিরক্তিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। অপরদিকে, সব ভুল নীরবে মেনে নেওয়ার পথও সঠিক নয়। তাই এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে একটু গভীরে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পক্ষে প্রথম ও সরল যুক্তিটি হলো, ভ্রান্ত তথ্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো একটি মিথ্যাকে যদি চ্যালেঞ্জ না করে পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হয়, তাহলে ক্রমশ মানুষ সেটিকেই সত্য হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘ইল্যুশরি ট্রুথ ইফেক্ট’। সুতরাং, একটি ভুলের প্রতিবাদে নীরবতা অবলম্বন করলে পরোক্ষভাবে সেই অসত্যকে প্রসারিত করতে সহায়তা করা হয়।
কখনো কখনো একটি সাধারণ ভুলও শুধরানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে, কারণ না হলে অপ্রত্যাশিত লজ্জার সম্মুখীন হতে হয়। একটি মজার উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে: একজন লেখককে তাঁর পিতা ছোটবেলায় বলেছিলেন, রাস্তার মাঝে সাদা লাইনের ওপর যে ছোট ছোট উঁচু দাগ থাকে, সেগুলো আসলে অন্ধ চালকদের জন্য, যাতে ব্রেইল পদ্ধতির মতো করে তাঁরা রাস্তা বুঝতে পারেন। তিন দশক ধরে লেখক এটাই বিশ্বাস করতেন। অবশেষে বন্ধুদের মাঝে কথাটি বলার পর তাদের বিস্মিত প্রতিক্রিয়া দেখে তিনি নিজের ভুলের ব্যাপকতা উপলব্ধি করেন।
স্বাস্থ্য অথবা চিকিৎসা বিষয়ক কোনো ভ্রান্ত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সেটি শুধরে দেওয়া নৈতিক দায় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, ভুল তথ্যের কারণে কারও মারাত্মক শারীরীক ক্ষতি অথবা আর্থিক ক্ষতি হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু বিপরীত পক্ষে, ভালো উদ্দেশ্য নিয়েও কারও ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি রাগ করতে পারেন। বিশেষ করে সবার সামনে কাউকে ভুল প্রমাণ করা হলে তিনি চরম অপমানিত বোধ করতে পারেন। অপমানিত ব্যক্তি সাধারণত নিজের ভুল স্বীকার না করে সেটিকে আরও শক্ত করে ন্যায়সম্মত প্রমাণের চেষ্টা চালান। এক্ষত্রে ‘ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট’ নামের এক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় কাজ করে। এই ইফেক্ট অনুসারে, কোনো বিষয় সম্পর্কে যার জ্ঞান সবচেয়ে কম, তার আত্মবিশ্বাস থাকে সবচেয়ে বেশি। ফলে, প্রকৃত জ্ঞানী মানুষটি প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় থাকেন।
ঘন ঘন ভুল ধরার কারণে বন্ধুরা আপনাকে ‘সবজান্তা শমসের’ অথবা ‘আঁতেল’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করতে পারে। বিখ্যাত মার্কিন চিকিৎসক ফিলিপ ম্যাকগ্রোর একটি চমৎকার উদ্ধৃতি আছে: ‘আপনি কি সঠিক হতে চান, নাকি সুখী?’ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সবসময় নির্ভুল হওয়ার চাইতে অনেকক্ষেত্রে নীর থেকে আত্মতৃপ্ত থাকাই বেশি গুরুত্ববহ।
অতএব, কারও ভুল ধরার আগে পাঁচটি বিষয় নিজেকে জিজ্ঞাসা করা বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমত, সম্পর্কের গভীরতা কেমন? ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ভুল ধরা যতটা সহজ, সদ্য পরিচিত বা বয়োজ্যেষ্ঠ কারও ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা নয়। দ্বিতীয়ত, বিষয়টি কতটা গুরুতর? কোনো সিনেমার মুক্তির বছর নিয়ে তর্কের কোনোর মূল্য নেই, কিন্তু ধর্ম, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের মত সংবেদনশীল বিষয়ে তর্ক উল্টো ফল ডেকে আনতে পারে। তৃতীয়ত, কণ্ঠস্বরের ব্যঞ্জনা: ‘তুমি একদম ভুল বলছো’ বলার পরিবর্তে ‘আমি একটি বইয়ে অন্যরকম পড়েছিলাম, একটু যাচাই করি’ বলার মাধ্যমে সুস্থ আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়। চতুর্থত, স্মার্টফোনের অপব্যবহার: গুগল সার্চ করে তাৎক্ষণিক কাউকে ভুল প্রমাণ করা খুবই সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এটি ঠিক নয়। পঞ্চমত, নিজের ভুলের ক্ষেত্রে: তর্কের পর যদি নিজের ভুল বের হয়, তবে হাসিমুখে সেটি স্বীকার করা সবচেয়ে ভালো কৌশল।
কৌশলীভাবে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো ব্যক্তিকে নির্জনে বলা। সবার সামনে নয়, বরং একটু আলাদা করে নিয়ে বলা যে, তার দেওয়া তথ্যটি কিছুটা ভুল মনে হয়েছে। এতে তার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে এবং সে কৃতজ্ঞতাও অনুভব করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, অন্যের ভুল ধরা খারাপ কিছু নয়; আসল বিষয় হলো উপস্থাপনার কৌশল। তর্কে জেতার চেয়ে সঠিক তথ্যের প্রচারই যেন উদ্দেশ্য হয়, আর অন্যর কাছ থেকে নতুন কিছু শেখার মানসিকতা থাকাই একজন স্মার্ট ব্যক্তির সবচেয়ে বড় পরিচায়ক।



