জেনারেটিভ এআই ও লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে তাৎক্ষণিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ পৌঁছে দিচ্ছে। ব্যবহারকারীরা যেকোনো সময় চ্যাটজিপিটি, ক্লদ, জেমিনি, গ্রক-এর মতো চ্যাটবটে লগ ইন করে তাদের মানসিক সমস্যার কথা জানাচ্ছেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর পাচ্ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘থেরাপি মাইক্রো-বার্স্ট’ নামক ধারণাটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যেখানে একটি ‘সেশন’ মাত্র কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়—ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক এক ঘণ্টার থেরাপি সেশনের সম্পূর্ণ বিপরীত এই ধারা।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাত ধরনের থেরাপি মাইক্রো-বার্স্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’, যেখানে ব্যবহারকারী উদ্বেগ, মানসিক চাপ বা রাগের মুহূর্তে এআই-এর সাহায্য নেন। দ্বিতীয়টি ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’, যেখানে কেউ একটি মন্তব্য বা সমালোচনার দ্রুত পুনর্ব্যাখ্যা চান। তৃতীয় বিভাগ ‘ডিসিশন সাপোর্ট’-এ সময়-সংকটপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য মানসিক সহায়তা নেওয়া হয়। চতুর্থ ‘বিহেভিয়োরাল অ্যাক্টিভেশন’—নিম্নমেজাজ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কী করা যেতে পারে, তার পরামর্শ নেওয়া। পঞ্চম ‘ইন্টারপার্সোনাল কাউন্সেলিং’, যেখানে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার আগে এআই ভূমিকা-পালন বা স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দেয়। ষষ্ঠ ‘ভ্যালুস রিফ্লেকশন’—জীবনের অর্থ বা মূল্যবোধ নিয়ে দ্বিধায় থাকা ব্যক্তিকে সহায়তা করে। সপ্তম এবং শেষ বিভাগ ‘মেটা-থেরাপিউটিক মাইক্রো-বার্স্ট’, যেখানে কেউ নিজের চলমান থেরাপির কার্যকারিতা নিয়ে এআই-এর মতামত নেয়।

এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর প্রবেশযোগ্যতা। প্রায় বিনামূল্যে বা খুব কম খরচে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিনই এটি ব্যবহার করা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহার করে দ্রুত মানসিক চাপ কমানো, জ্ঞানগত ভার হালকা করা সম্ভব। তবে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিও রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এআই প্রায়শই অনুপযুক্ত বা বিপজ্জনক পরামর্শ দিতে পারে। ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের আগস্টে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগে ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরও আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এআই ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্তিকর চিন্তাভাবনা তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে, যা আত্মক্ষতির কারণ হতে পারে।

ঐতিহ্যবাহী থেরাপির সঙ্গে তুলনা করলে সময়, জ্ঞানগত প্রক্রিয়া ও আচরণগত দিক থেকে পার্থক্য স্পষ্ট। এআই-ভিত্তিক মাইক্রো-বার্স্টে ব্যবহারকারী নিজের ইচ্ছামতো সময় দেন, কোনো কাঠামোবদ্ধ সেশন পদ্ধতি নেই। অন্যদিকে, মানব থেরাপিস্টরা সাপ্তাহিক নির্ধারিত সময়ে গভীর সম্পর্ক ও পদ্ধতিগত চিকিৎসা দেন। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনেক ব্যবহারকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এআই-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন, যা তাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

চ্যাটজিপিটি-র সাপ্তাহিক ৯০ কোটির বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে এআই-এর পরামর্শ নেয়। এই প্রবণতাকে ‘বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে, যেখানে সবাই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অংশগ্রহণ করছে। বিশেষায়িত এলএলএম তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেগুলো এখনো উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।

এআই-এর এই দ্বৈত ব্যবহার—যেখানে এটি যেমন মানসিক স্বাস্থ্যকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি ক্ষতিও করতে পারে—পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এআই-কে যেন অতি দ্রুত বিচার-বিবেচনা ছাড়া বা অতিরিক্ত আস্থার সঙ্গে ব্যবহার না করা হয়। একইসঙ্গে, মানব থেরাপিস্টদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে যে তাদের ক্লায়েন্টরা এআই-এর মাধ্যমে থেরাপির মান যাচাই করছে। শেষ পর্যন্ত এআই যাতে মানব মনের ‘বাগান’টি সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ।