মাঠের ধারের সুড়ঙ্গ পেরোলেই লুকিয়ে থাকে এক ভিন্ন জগৎ। বিশ্বকাপের ড্রেসিংরুম কিন্তু সাধারণ কোনো কক্ষ নয়। এটি যেন একটি ছোট ল্যাবরেটরি ও পাঁচ তারকা হোটেলের মিশেলে তৈরি। ফিফার একটি মজার নিয়ম হলো দুই প্রতিপক্ষ দলের ড্রেসিংরুম হতে হবে হুবহু সমান। আকার, সাজসজ্জা ও সুযোগ-সুবিধায় কোনো তারতম্য থাকবে না। বিশ্বকাপ নিরপেক্ষ আসর হওয়ায় কোনো দলই ‘হোম টিম’ সুবিধা পায় না। ঘরোয়া লিগে স্বাগতিক দলের ঘর জমকালো আর অতিথি দলের ঘর সাদামাটা থাকলেও বিশ্বকাপে তা নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ রাখতে ফিফা এই শর্ত দিয়েছে।
একটি বিশ্বকাপ মানের ড্রেসিংরুম কয়েকটি ভাগে বিভক্ত থাকে। খেলোয়াড়, কোচ-কর্মকর্তা, ফিজিওথেরাপি ও জিনিসপত্র রাখার আলাদা জায়গা থাকে। মূল ঘরে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য তালা দেওয়া লকার, আরামদায়ক বেঞ্চ, কোচের কৌশল বোঝানোর জন্য বড় হোয়াইটবোর্ড বা ডিজিটাল স্ক্রিন থাকে। ম্যাসাজ টেবিল, ফ্রিজ, সেন্ট্রাল এসি ও হিটারও থাকে। দেয়াল-মেঝে এমনভাবে তৈরি যাতে সহজে পরিষ্কার করা যায়। আলাদা শৌচাগার-বাথরুম, একাধিক শাওয়ার, আয়নাসহ বেসিন, বুট ধোয়ার সিংক ও চুল শুকানোর ড্রায়ার—সবই আছে।
ম্যাচ শেষে দ্রুত রিকভারির জন্য আধুনিক ড্রেসিংরুমে আইস বাথ বা কোল্ড প্লাঞ্জ থাকে। এটি পেশির ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। হাইড্রোথেরাপি, চিকিৎসার টেবিল ও ফিজিওথেরাপির জন্য আলাদা কর্নার রাখা হয়। মূল ঘরের পাশেই ম্যাসাজের ঘর থাকে, যাতে খেলোয়াড়রা নিরিবিলি পরিবেশে চাঙা হতে পারেন।
টানেলের ওপারে আরও কিছু কক্ষ আছে যা সাধারণত অজানা। রেফারি, ডোপ-টেস্ট ও ফিফার প্রতিনিধিদের জন্য আলাদা ঘর থাকে। বদলি খেলোয়াড়দের ওয়ার্ম-আপের জায়গাও সমান আকারের হয়। ড্রেসিংরুম থেকে মাঠ পর্যন্ত নিরাপদ ও ব্যক্তিগত পথ থাকে, যেখানে দর্শক বা সাংবাদিক ঢুকতে পারেন না।
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে নানা উত্তেজনা বা আনন্দের মুহূর্ত তৈরি হয়। কারও পানির বোতল ছোড়া, কোচের শান্ত করার ঘটনা—এসব নিয়ে অনেক গল্প আছে। তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হলো জাপানের আচরণ। ১৪ জুন ডালাসে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ২-২ ড্রয়ের পর জাপান দল তাদের ড্রেসিংরুম পরিষ্কার করে রাখে। চেয়ার সাজানো, তোয়ালে ভাঁজ করা, ময়লা গোছানো—এ দায়িত্বশীল আচরণ মাঠের বাইরে ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। ২০২২ সালেও তারা জার্মানিকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে কাগজের তৈরি সারস ও ধন্যবাদের চিঠি রেখে গিয়েছিল। জাপানের স্কুলে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের নিজেদের ক্লাসরুম পরিষ্কার করতে শেখানো হয়—সেই অভ্যাস বিশ্বমঞ্চে প্রকাশ পায়।
ইরানের ফুটবলাররাও এবারের বিশ্বকাপে আতিথেয়তা নিয়ে চিঠি লিখে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাদের রেখে যাওয়া চিঠি দর্শকদের ম্যাচ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। দলের ফরমেশন, বল পাওয়ার পর আক্রমণ, ডিফেন্সের সময় ফর্মেশন পরিবর্তন—এসব লক্ষ করলে খেলা আরও উপভোগ্য হয়। ধারাভাষ্যকারের ‘বাস পার্ক করল’ বললে এখন মুচকি হাসি আসবে। খেলোয়াড়রা টানেল দিয়ে চোখের আড়াল হলে কল্পনা করা যায় সেই রহস্যময় ঘর, যেখানে আইস বাথ, ট্যাকটিকসের হোয়াইটবোর্ড ও ভাঁজ করে রাখা তোয়ালে থাকে। ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, এর ভাষা, অঙ্ক, বিজ্ঞান ও কোচের মস্তিষ্কও জড়িত। সেই গোপন দুনিয়া যত বুঝবেন, খেলাটি তত সুন্দর ও মজার হয়ে উঠবে।




