দেশীয় লজিস্টিকস খাত সুরক্ষার প্রশ্নে গোলটেবিল আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘লজিস্টিকস খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ও নীতি সংস্কার’ শীর্ষক এ আলোচনায় বক্তারা বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের মতো লজিস্টিক খাতে বিদেশি যৌথ মালিকানার কোম্পানিগুলোকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের মুনাফা দেশ থেকে বিদেশে চলে যাবে। এতে তরুণদের জন্য এই খাতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ বন্ধ হবে এবং পণ্য আমদানি-রপ্তানি যেকোনো সময় সংকটের মুখে পড়তে পারে।

সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং বিধিমালা সংশোধন করছে। বর্তমানে যৌথ মালিকানায় বিদেশি কোম্পানির সর্বোচ্চ অংশ ৪০ শতাংশ। সংশোধিত খসড়ায় এই সীমা ৫১:৪৯ করার প্রস্তাব রয়েছে। এমনকি শতভাগ বা ৪০ শতাংশের বেশি বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের পথ খুলে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে নতুন লাইসেন্স দেওয়ার সময় শতভাগ বিদেশি মালিকানা ছিল, পরে তা ৪৯ থেকে ৪০ শতাংশে নামানো হয়।

সাকিব আনোয়ার আরও বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি স্বল্প সম্পদভিত্তিক সেবাশিল্প যেখানে বিদেশি বিনিয়োগের কোনো সুফল দেশ পায় না। এই ব্যবসায় প্রবেশের প্রকৃত খরচ কার্যত শূন্য। শাখা কার্যালয়ের ক্ষেত্রে বিডার অনুমোদনের পর দুই মাসের মধ্যে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আকারে আনতে হয়, যা মূলধন নয় বরং অফিস পরিচালনার ব্যয়। তিনি অভিন্ন ৬০:৪০ ইকুইটি কাঠামো, শেয়ার, লভ্যাংশ অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকারসহ ছয়টি প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিদেশি অংশীদারত্বযুক্ত লাইসেন্সধারীর জন্য ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবরুদ্ধ হিসাবে সংরক্ষণ এবং তার ৪০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে গুদাম, সরঞ্জাম ও পরিবহনে বিনিয়োগের শর্ত।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় কোনো বিনিয়োগ না করেই মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৬০ থেকে ৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবকে তিনি বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সভাপতি মো. আরিফুল আহসান জানান, তাদের সংগঠনে ১ হাজার ২৫০ সদস্যের মধ্যে ১৩টি বিদেশি মালিকানা ও ৩০-৩৫টি যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা মোট ব্যবসার ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, অথচ তাদের বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই। ব্যবসার মুনাফা সম্পূর্ণ বিদেশে চলে যায়।

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএইএবি) সভাপতি কবির হোসেন বলেন, দেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে তা প্রয়োজন নেই। একই অফিস, লোক ও জ্ঞান নিয়ে বিদেশি কোম্পানি কার্যকর পরিচালনা করছে, যা আগে দেশীয় এজেন্টরা করত।

আরআইএফ লাইনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের লাইসেন্স হস্তান্তরযোগ্য নয় এবং অভিজ্ঞতা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এ কারণে নতুন প্রজন্ম এই ব্যবসায় আসছে না। আশির দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা পণ্য রপ্তানির জন্য জাহাজ ভাড়া করতেন এবং ধীরে ধীরে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসা গড়ে তোলেন। সেই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।

আইনজীবী এম সাকিবুজ্জামান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেই স্থানীয় এজেন্টরা অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েন। ব্যবসা ও রাজনীতি এক হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। জাহাজের পণ্য কে হ্যান্ডেল করবে তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতারা দুশ্চিন্তায় থাকেন। তাই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আকিল বলেন, বিডাকে স্পষ্ট করতে হবে তারা বিদেশি বিনিয়োগ চান নাকি বাণিজ্য চান। বিনিয়োগ আনতে হলে সহজ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কম টাকা লাগে, তাই এই খাত সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন।

সংসদ সদস্য ফজল হুদা বলেন, নওগাঁ থেকে কারওয়ান বাজারে এক ট্রাক আলু আনতে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। নওগাঁ থেকে রেললাইন নির্মাণে শতভাগ বিদেশি মালিকানা স্বাগত জানানো যাবে, কিন্তু ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কেন কাগজ বেচে বিদেশিদের সুবিধা দেওয়া হবে? তিনি মনে করেন যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪০ শতাংশ থাকা উচিত। ভারত ও শ্রীলঙ্কাতেও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে দেশি কোম্পানিকে সুরক্ষা দিতে কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে।

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন, আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হুসাইন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন মাহমুদ অ্যান্ড সবুজ কোম্পানির অংশীদার সবুজ এইচ চৌধুরী।