কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত কিনবার্ন স্পিট একটি দীর্ঘ বালুকাময় উপদ্বীপ। ডিনিপ্রো-বাগ মোহনার প্রবেশপথ ও মিকোলাইভ ও খেরসন বন্দরে যাতায়াতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটি ২০২২ সালের জুন থেকে রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে। এর পর থেকে বারবার ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলা ও উভচর অভিযানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এই উপদ্বীপ। তবে সম্প্রতি ইউক্রেন এক নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে, যা যুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম বলে দাবি করছে দেশটির সামরিক বাহিনী।

গত ১৩ জুলাই ইউক্রেনের ১২৩তম সেপারেট টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ব্রিগেড একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় একটি মানবহীন নৌযান (USV) কিনবার্ন স্পিটের তীরে ভিড়ছে। এর র্যাম্প নামতেই একটি ট্র্যাক করা রোবট (UGV) তীরে নেমে আসে এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত মেশিনগানের গুলি ছোড়ে। এই রোবটটিতে .৫০ ক্যালিবার মেশিনগান বসানো ছিল। ব্রিগেডের বিবৃতিতে জানানো হয়, এটি বিশ্বের প্রথম এমন সামরিক অভিযান যেখানে একটি মানবহীন স্থলযানকে মানবহীন নৌযানের মাধ্যমে শত্রুঅধ্যুষিত অঞ্চলে পৌঁছে দিয়ে যুদ্ধ মিশন সম্পাদন করা হয়েছে।

এই 'মারসুপিয়াল ড্রোন' কৌশলটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এর মাধ্যমে এক ধরনের 'রিমোট কম্বাইন্ড আর্মস' কৌশল বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখানে UGVs বিভিন্ন ধরনের ড্রোন (স্কাউট, বোমারু ও FPV আক্রমণ ড্রোন) এর সাথে সমন্বয় করে শত্রু অবস্থান ধ্বংস করে এবং নিজেদের সৈন্যের ঝুঁকি এড়ায়। ইউক্রেন ইতিমধ্যেই UGV উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ২০২৫ সালে ১০ হাজার ইউনিট উৎপাদনের পর ২০২৬ সালে লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার।

DevDroid TW 12.7 মডেলের এই যুদ্ধ রোবটটির আকার একটি কোয়াড বাইকের সমান এবং এতে রিমোট-কন্ট্রোল টারেট বসানো থাকে। প্রতি ইউনিটের দাম প্রায় ৩০ হাজার ডলার। এর গতি ঘণ্টায় প্রায় ৪ মাইল এবং রুট পরিকল্পনার জন্য ড্রোনের সহায়তা নেওয়া হয়। ইউক্রেনের ৩য় অ্যাসল্ট ব্রিগেডের কমান্ডার মাইকোলা জিনকেভিচ দাবি করেন, একটি DevDroid ৪৫ দিন ধরে ফ্রন্টলাইন পজিশনে অবস্থান করে একা রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধ করেছে। সেখানে কোনো সৈন্য ছিল না, রোবটটি মাঝে মাঝে চার্জ ও পুনরায় অস্ত্র ভরার জন্য ফিরে আসত।

ইউক্রেনের ৩য় আর্মি কোরের কমান্ডার আন্দ্রি বিলেতস্কি বছরের শেষ নাগাদ ফ্রন্ট-লাইন পদাতিক সৈন্যের এক-তৃতীয়াংশ UGV দিয়ে প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে যন্ত্রমানবের ব্যবহার বাড়লে মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি অনেক কমে আসবে। অধিকন্তু, অভিযান চলাকালে রোবটটি ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে কোনো ক্ষতি নেই, কারণ এটি সম্পূর্ণ বিনিময়যোগ্য।

উভচর আক্রমণের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরম্যান্ডি অভিযানের মতো বিশাল উভচর আক্রমণে হাজার হাজার সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু রোবট নেতৃত্বাধীন আক্রমণে সেই ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। ভবিষ্যতে রোবটরাই প্রথমে তীরে নেমে এলাকা নিরাপদ করবে, তারপর মানব সৈন্যরা অবতরণ করবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বর্তমানে কিনবার্ন স্পিটে রুশ বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। জুন মাসে ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) জানিয়েছিল রুশ বাহিনী স্পিট থেকে সরে গেছে, তবে ইউক্রেনীয় নৌবাহিনীর মুখপাত্র বলেছেন, শত্রু সম্পূর্ণরূপে পিছু হটেছে বলা এখনই সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের নতুন কৌশল ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরণ বদলে দিতে পারে।