উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তা গড়াইত সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবন এখন সংকটে। জমি-জমা হারিয়ে তারা প্রায় সবাই ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন। নিজেদের কোনো আবাদি জমি নেই বললেই চলে, খাসজমিতে গাদাগাদি করে বাস করতে হচ্ছে তাদের। খেতমজুরের কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা।

তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়ার ২০ থেকে ২৫টি গ্রামে ছড়িয়ে থাকা গড়াইতদের মোট সংখ্যা মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি হিংগু মুর্মু জানান, ভারতের নাগপুর থেকে গড়াইতদের পূর্বপুরুষেরা উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওঁরাওদের বেশ মিল রয়েছে।

একসময় বরেন্দ্রভূমি ছিল ঘন জঙ্গলে আচ্ছন্ন। অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মতো গড়াইতরাও সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদি জমি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই জমি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন–২০১০’-এর আওতায় ২৭টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে গেজেটভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের সংশোধিত গেজেটে সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়, যার মধ্যে ৩৯টি সমতলের এবং সেই তালিকায় গড়াইতদের নামও রয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের মান্ডইল (অনেকে মাড়ইলও বলেন) গ্রামটি গড়াইতদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। সম্প্রতি সেই গ্রামে গিয়ে মন্দিরের সামনে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মনাম সরদার, হরেন সরদারসহ আরও অনেকের সঙ্গে কথা হয়। উপজেলার ওঁরাওদের দিঘরী পরিষদের প্রধান (রাজা) নিরেন খালকোও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাকে দেখে এগিয়ে আসেন তার এক সময়ের সহপাঠী মান্ডইল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, অতীতে গড়াইতদের জমিজমা ছিল, কিন্তু এখন তা প্রায় নেই বললেই চলে। যে জমির ওপর উচ্চবিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত, সেটিও ছিল গড়াইতদেরই। বর্তমানে এই স্কুলে গড়াইত সম্প্রদায়ের ২৫-২৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে তাদের মধ্যে ছয়জন। শিক্ষকদের দেওয়া অর্থ দিয়ে ফরম পূরণ করা হলেও পরে কৃষিকাজ করে সেই টাকা ফেরত দিয়েছে তারা।

শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম আরও জানান, গড়াইতদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অনেক বেশি। অনেক শিক্ষার্থী না খেয়েই বিদ্যালয়ে আসে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এসএসসি পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ে। বিশেষ করে মেয়েরা বাল্যবিবাহের কারণে বেশি ঝরে যায়।

গড়াইতরা জানান, মান্ডইল গ্রামের তিনটি পাড়ায় মোট প্রায় ১০০ গড়াইত পরিবারের বাস। এর মধ্যে মাত্র তিনটি পরিবারের সামান্য জমি রয়েছে; বাকিরা সবাই ভূমিহীন এবং খাসজমিতে বসবাস করে। গোদাগাড়ীর কাঁকনহাটের কাছে সেরুপাড়ায় ৫৫টি পরিবার বাস করে, যাদের মধ্যে মাত্র তিনটির নিজস্ব বসতভিটা আছে। কাঁকনহাট-সংলগ্ন দলদলা গ্রামে ৭০ থেকে ৭৫টি পরিবারের বসবাস। গ্রামের মোড়ল ডালিম সরদার জানান, এই গ্রামের ১০টি পরিবার নিজেদের সামান্য জমিতে বাস করলেও বাকিরা খাসজমিতে ঠাসাঠাসি করে থাকে। কারোই আবাদি জমি নেই।

দলদলা গ্রামের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ৯১ বছর বয়সী সরেশ সরদার লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। তিনি জানান, তার জন্ম এই গ্রামেই। পূর্বপুরুষেরা যখন এ দেশে এসেছিলেন, তখন অঞ্চলটি জঙ্গলে ভরা ছিল। তাদের নিজেদেরও ১০-১২ বিঘা জমি ছিল, কিন্তু এখন কিছুই নেই। খাসজমিতেই তাকে থাকতে হচ্ছে। তার ভাষ্য মতে, ১৯৬২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় অনেকে দেশত্যাগ করেন। স্বাধীনতার পর ভারত থেকে ফিরে এসে তারা দেখেন, তাদের জমিজমা বেদখল হয়ে গেছে।

নওগাঁর গড়াইতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বসবাস নিয়ামতপুর উপজেলায়, বিশেষত চন্দননগর ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের হড়পা গ্রামের গড়াইত নেতা বিজয় সরদার জানান, নিয়ামতপুর ও গোদাগাড়ী মিলিয়ে ১৫-১৬টি গ্রামে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জন গড়াইতের বসবাস।

মান্দইল গ্রামের স্নাতক পাস বেসরকারি চাকরিজীবী মাখন সরদার (৪১) বলেন, তিনি শুনেছেন, একসময় গড়াইতদের অনেকের গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধান ছিল; তার দাদারও ছিল। এখন সেই অবস্থা দেখে মনে হয়, সেটা কি শুধুই গল্প ছিল?