সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য কৌশলগত পরিবর্তন ঘটেছে, যেখানে দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলো নিজেদেরকে নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। আন্তোনিও গ্রামসির দেওয়া সাবঅলটার্ন ধারণাটি মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত এবং কণ্ঠহীন জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণপন্থীরা এই ধারণাটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক সংকট, যেমন বেকারত্ব, মজুরি বৈষম্য এবং বাসস্থানের অভাবকে আড়াল করার অপচেষ্টা করছে।
সাধারণত যারা সামাজিক রূপান্তর ও প্রগতির বিরোধী, জাতিগত বা ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী এবং বর্তমান বৈষম্যমূলক কাঠামো ধরে রাখতে চায়, তাদের দক্ষিণপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ এই গোষ্ঠীগুলোই এখন নিজেদের 'মজলুম' ও 'ক্ষমতাহীন' বলে দাবি করছে, যা স্ববিরোধী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অনেক দেশেই দক্ষিণপন্থীদের হাতে ব্যাংক, বিমা, মিডিয়া ও ওষুধ কোম্পানিসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই সাফল্যের পরও নিজেদের বঞ্চিত দাবি করা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দক্ষিণপন্থীদের এই আচরণের মূল লক্ষ্য হলো সাংস্কৃতিক যুদ্ধ সৃষ্টির মাধ্যমে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া। ওড়না, ভাস্কর্য বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম বিতর্ক তৈরি করে তারা সমাজের উলম্ব বৈষম্যকে আড়াল করে অনুভূমিক বিভেদ সৃষ্টি করে। এর ফলে একই শ্রেণির মানুষরা পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় এবং প্রকৃত শোষকদের থেকে নজর সরে যায়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পরও এই ধরনের সাংস্কৃতিক যুদ্ধের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে প্রকৃত নিম্নবর্গের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে।
অধিকন্তু, দক্ষিণপন্থীরা নিজেদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের ভুক্তভোগী হিসেবেও উপস্থাপন করে। তাদের দাবি, প্রভাবশালী চিন্তাকেন্দ্রগুলোতে তাদের অবহেলা করা হয় এবং তারা চিন্তার জগতে নিপীড়িত। এই 'ভিকটিমহুড' কৌশলের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করে। তবে তাদের এই অবস্থান মূলত করপোরেটতন্ত্র ও সামরিকায়নের স্বার্থে জনমত তৈরি করারই একটি কৌশল। জাতীয় বাজেটের বড় অংশ সামরিক ব্যয়ে বরাদ্দের পক্ষে জনমত গঠনেও এই কৌশল কাজে লাগানো হয়।
সাবঅলটার্ন বা নিম্নবর্গের মানুষদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের নিজস্ব অর্গানিক বা জৈব বুদ্ধিজীবীর অভাব। যারা তাদের শ্রেণির ভেতর থেকে উঠে এসে তাদের প্রকৃত দ্বন্দ্ব ও সমস্যার সমাধানের পথ দেখাবে। দক্ষিণপন্থীরা সবসময় এই ধরনের বুদ্ধিজীবীদের প্রচার ও প্রসারে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের প্রকৃত শত্রু-মিত্র চিনতে ভুলে যায়। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক সংগ্রামকেও অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র থেকে 'প্রতিক্রিয়াশীল' হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে, যা দক্ষিণপন্থীদের পরিকল্পিত কর্মসূচির অংশ বলে মনে করা হয়।
এই সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, দক্ষিণপন্থীদের সাবঅলটার্ন সাজার এই প্রবণতা আসলে বৈশ্বিক করপোরেট স্বার্থ ও বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে রক্ষা করার একটি নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ। এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে বিভ্রান্ত করার একটি পরিশীলিত পদ্ধতি, যা বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।




