গবেষণা শব্দটির প্রতি বাঙালির ভালোবাসা যেন জন্মগত। কোনো লেখার শুরুতে 'গবেষণায় প্রমাণিত' বাক্যটি দেখলেই পাঠক তা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে নেন—সেই গবেষণা সত্যিই হয়েছে কি না, কে করেছে, কী পদ্ধতিতে হয়েছে—এসব যাচাই করার আগ্রহ তাদের থাকে না। এই মনোভাব নিয়েই এক কৌতুকময় লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে গবেষণা-বিমুখতা ও গবেষণার অপব্যবহারের চিত্র।

বাংলাদেশে গবেষণা নিয়ে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়। একদিকে 'গবেষণা' শব্দটি মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়, অন্যদিকে প্রকৃত গবেষণা কাজটি সবারই অপছন্দের তালিকায়। সমাজে কোনো ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ গবেষণার বদলে অনুমানের ওপরই ভরসা করে। কারও সাথে কারও কথা বলতে দেখা গেলে প্রেমের সম্পর্ক ধরে নেওয়া হয়, বুকে ব্যথা মানেই গ্যাস্ট্রিক, আর কেউ ঘরে থাকলে তাকে সন্দেহজনক কাজে জড়িত মনে করা হয়।

লেখক তার খালাতো ভাই সজিবের গল্পও তুলে ধরেছেন, যিনি গবেষণার নামে নিমগাছের সাথে কলম করে গাঁজাগাছ তৈরি করার পদ্ধতি নিয়ে কয়েক বছর ধরে গবেষণা করছিলেন। ছেলেটিকে প্রথমে বড় বিজ্ঞানী মনে হলেও পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে গবেষণার প্রকৃত রহস্য ধরা পড়ে। এ ঘটনা থেকে লেখক উপসংহার টেনেছেন যে, গবেষণারও একটি নৈতিক সীমা থাকা উচিত।

দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-গবেষকদের নিয়ে প্রকাশিত বেশ কিছু ঘটনায় গবেষণার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি চুরি ও অনিয়মের কারণে বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। নর্থ সাউথ, ড্যাফোডিল, ঢাবির মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা কেউ অন্যের গবেষণা কপি করেছেন, কেউ গুগল থেকে সরাসরি তুলেছেন। একজনের একারই ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটে লেখক বিদ্রুপ করে বলেছেন, প্রত্যাহার করা গবেষণাপত্রের ইতিহাস নিয়ে ওই শিক্ষক চাইলে পিএইচডি করতে পারেন। এমনকি 'কপি-পেস্ট' বিষয়ে দক্ষ মানুষদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন বিভাগ খোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে—'Department of Advanced Copy-Paste Engineering' নামে, যেখানে Ctrl+C এবং Ctrl+V-এর ব্যবহার শেখানো হবে, সেইসাথে প্ল্যাজিয়ারিজম ধরার পদ্ধতি এড়ানোর কৌশলও পাঠ্যক্রমে থাকবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই আজব গবেষণার কোনো অভাব নেই। 'তরুণদের মধ্যে পরকীয়া কেন বাড়ছে', 'ব্যাঙের মূত্রথলি ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায়', 'সকালে তিনবার হাঁচি দিলে প্রেমে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়'—এমন হাজারো গবেষণার শিরোনাম প্রতিদিন দেখা যায়। এই গবেষণাগুলো কারা, কোথায়, কী উদ্দেশ্যে করে—সেটি নিয়ে আলাদা গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেছেন লেখক।

গবেষণার অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও নতুন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫৮ শিক্ষক গবেষণার টাকা নিয়েও কোনো প্রতিবেদন জমা দেননি বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাকে লেখক গবেষণা জগতের নতুন দিগন্ত হিসেবে ব্যঙ্গ করেছেন। তাদের এই আচরণের পেছনেও গভীর গবেষণা আছে বলে তিনি মনে করেন, যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

গবেষণা নিয়ে লেখা এই ব্যঙ্গাত্মক নিবন্ধটি নিজেই কোনো গবেষণা ছাড়া লেখা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন লেখক। তথ্য সংগ্রহ, নমুনা নির্বাচন, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ—কোনোটিই তিনি করেননি। গবেষণা ছাড়া এত বড় লেখা কীভাবে সম্ভব হলো, সেটিই এখন পাঠকদের জন্য গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়াল।