দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নগর বরিশাল দিন দিন উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং এর পাশাপাশি বৃষ্টিপাতের পরিমাণও কমছে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে। প্রচণ্ড গরম শুধু অস্বস্তিই বাড়াচ্ছে না, মানুষের কর্মক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে দেখা গেছে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিগত ৬০ বছরে বরিশালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। অপরদিকে, একই সময়ে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কমেছে শূন্য দশমিক ১৮ মিলিমিটার।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল্লাহ সালমান ও ফয়সাল আহমেদের গবেষণাপত্রটি ২০২০ সালে মালয়েশিয়ান জার্নাল অব জিওসায়েন্সেস-এ প্রকাশিত হয়। গবেষকরা ১৯৬১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যের পাশাপাশি নাসা এবং মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, বরিশালে বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ০০৫৫ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ০০৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। অর্থাৎ, দিনের তুলনায় রাতের তাপমাত্রা অনেক দ্রুত বাড়ছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি জুন মাসে এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ফেব্রুয়ারি মাসে। এছাড়া শীত, প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমার প্রবণতাও স্পষ্ট, বিশেষ করে জুন মাসে বৃষ্টিপাত সবচেয়ে বেশি কমেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশগত ভূপদার্থবিদ্যায় পিএইচডি গবেষণারত আবদুল্লাহ সালমান জানান, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাত হ্রাসের কারণে মাটির আর্দ্রতা কমছে, সেচনির্ভরতা এবং উপকূলীয় লবণাক্ততা বাড়ছে। জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত একত্রে জনস্বাস্থ্যের জন্য জটিল ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর মতে, বরিশাল দ্রুত একটি উষ্ণ ও অধিক আর্দ্র জলবায়ুর দিকে এগোচ্ছে এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, নগরে সবুজায়ন ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
তাপমাত্রার এই পরিবর্তনের প্রভাব বরিশাল নগরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রকট। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে এবং বর্ষাকালেও বৃষ্টিপাত অনিয়মিত। বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রা খুব একটা কমছে না, ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। নগরের রূপাতলী এলাকার বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক জানান, এখন গ্রীষ্ম-বর্ষা সব সময়ই ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চালাতে হয়, তবুও স্বস্তি মেলে না। তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টাই ফ্যান চালিয়ে রাখতে হয়। তবু স্বস্তি পাওয়া যায় না। যেভাবে গরম বাড়ছে, তাতে এসি ছাড়া টেকা কঠিন।’ বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘অসহনীয় জীবন: তাপের প্রভাব, স্বাস্থ্য ও বাংলাদেশের অর্থনীতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার (২২ হাজার কোটি টাকার বেশি), যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের ওপর। নগরের সাগরদি এলাকার রিকশাচালক আবুল কালাম (৪৮) জানান, আগে সকালে রিকশা নিয়ে নেমে রাত ১১টা পর্যন্ত চালাতে পারতেন, কিন্তু এখন গরমের কারণে হাঁপিয়ে ওঠেন এবং তাঁর আয় অনেক কমে গেছে।
তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত এবং ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরের পলাশপুর বস্তিতে, যার জনসংখ্যা ছয় হাজারের বেশি, গত বছরের মাঝামাঝি চর্মরোগ স্ক্যাবিস ছড়িয়ে পড়েছিল। বস্তির বাসিন্দা রুবিনা খাতুন জানান, আগে এই রোগ সেখানে দেখা যায়নি, গত বছরই প্রথম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং এ বছরও কমবেশি রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া স্ক্যাবিসের জন্য দায়ী পরজীবীর বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল। বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গাইনোকোলজিস্ট শিখা রাণী সাহা বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এখন বেশি রোগী আসছে জননতন্ত্রে প্রদাহ, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন জটিলতা নিয়ে, বিশেষ করে প্রথম তিন মাসে অতিরিক্ত বমি ও ঘামের কারণে পানি ও লবণ শূন্যতার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ডায়রিয়া ও ডেঙ্গুর বিস্তারের ক্ষেত্রেও বরিশাল বিভাগে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২১ সালে আকস্মিকভাবে ডায়রিয়ার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়, যাতে ৩৩ জনের মৃত্যু হয় এবং লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি ছিল। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে প্রথম বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, যাতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ১৮ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০২২ সালে ১১ জন, ২০২৩ সালে ৫০ জন এবং ২০২৪ সালে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন ২১ হাজার ৮১৫ জন এবং মারা যান ৫১ জন। চলতি বছর ২০ জুলাই পর্যন্ত বিভাগে ৩ হাজার ১৫০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন, মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়রিয়ার সঙ্গে গরমের সম্পর্ক রয়েছে কারণ এই সময়ে খাবার ও পানি দ্রুত দূষিত হয় এবং ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবিস্তার করে। নিরাপদ পানির সংকট ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে, অনিয়মিত বৃষ্টি ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। চিকিৎসায় বাড়তি ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। বরিশাল নগরের উপকণ্ঠের কাগাশুরা এলাকার আশিকুর রহমান (২৮) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ১৩ জুলাই বরিশাল সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ছয় দিন ছিলেন। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা খরচে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ইনজেকশন বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে, যাতে ২০ হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়েছে।
এই সংকটের মধ্যেই বরিশালের ঐতিহাসিক রাজা বাহাদুর সড়ক ও সংলগ্ন এলাকাটি যেন এক টুকরা প্রাকৃতিক শীতল দ্বীপ হিসেবে টিকে আছে। দুটি বৃক্ষশোভিত সড়ক, দুটি দিঘি, একটি বিশাল উদ্যান এবং ব্রিটিশ আমলের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিশাল চত্বরজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী বৃক্ষের ঘন ক্যানোপি (গাছগুলোর ওপরের ডালপালা এবং পাতা মিলে যে প্রাকৃতিক ছাদ) পুরো এলাকাকে ঢেকে রেখেছে, ফলে গরমের দিনেও এখানকার পরিবেশ তুলনামূলক শীতল থাকে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এমন সবুজ করিডর শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আরবান ফরেস্ট্রি অ্যান্ড আরবান গ্রিনিং জার্নালে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে নগরে সবুজায়নের প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে গবেষকরা বলছেন, শহরের তাপ কমাতে শুধু বৃক্ষরোপণ যথেষ্ট নয়; বরং স্তরযুক্ত সবুজায়ন এবং পরিকল্পিত নগর নকশা অপরিহার্য। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন মুভমেন্ট’-এর সমন্বয়ক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, এই প্রেক্ষাপটে বরিশাল শহরের রাজা বাহাদুর সড়ক ও আশপাশের এলাকাটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, এই সড়কে বিদ্যমান ঘন ক্যানোপি ছায়া সরাসরি সূর্যালোককে বাধাগ্রস্ত করে এবং পাশাপাশি দুই পাশের বৃক্ষসারি বিকিরিত তাপ কমিয়ে দেয়, ফলে বাতাস চলাচল কিছুটা বজায় থাকে এবং সামগ্রিকভাবে একটি তুলনামূলক শীতল ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়। বরিশাল নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. বায়েজিদ জানান, রাজা বাহাদুর সড়কের মতো ছায়াঘেরা সবুজ সড়ককে ভিত্তি ধরে শহরের প্রধান সড়কগুলোকে একীভূত সবুজ নেটওয়ার্কে রূপ দেওয়া সম্ভব। তাঁর মতে, সদর রোড, বান্দ রোড, পুলিশ লাইনস রোড এবং সিঅ্যান্ডবি রোডকে সংযুক্ত করে একটি ধারাবাহিক নগর সবুজ করিডর গড়ে তোলা যেতে পারে এবং একেক এলাকায় একেক প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হলে আলাদা বৈচিত্র্য আনা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, এই মডেল অনুসরণ করে নতুন সড়ক ও উন্নয়ন প্রকল্পে স্তরযুক্ত সবুজায়ন (গাছ, ঝোপঝাড় ও নিচু গাছপালা) নিশ্চিত করা গেলে শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে এবং একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্যও বৃদ্ধি পাবে।




