ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কে জড়িয়েছে হায়দরাবাদের ন্যাশনাল একাডেমি অব লিগাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ (নালসার)। বিশ্ববিদ্যালয়টির বার্ষিক সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন জেন-জি প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা ও বিতর্ক আরও বেড়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের মন্তব্যে। তিনি আইন পেশার সঙ্গে জড়িত সবাইকে একত্রিত হওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আইন পেশার সব তেলাপোকা একত্র হলে কী হবে?’ এই পরিস্থিতিতে সমাবর্তনের তারিখ এখনো ঘোষণা করেনি নালসার কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, যে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (বিসিআই) নালসার থেকে পাস করা কাউকে নথিভুক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছিল, তাদেরও পিছু হটতে হয়েছে। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করেছে বিসিআই, যদিও তেলাপোকাদের দাবি ছিল তদন্ত ও দোষীদের চিহ্নিত করার নির্দেশও প্রত্যাহার করতে হবে।
বিতর্কের সূত্রপাত নালসারের উপাচার্য সম্প্রতি ২০২৬ সালের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানালে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশ উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও অধ্যাপকদের কাছে চিঠি দিয়ে দাবি জানান, যিনি জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ শুনতে এবং ভিডিও দেখতে অস্বীকার করেছিলেন, তাঁর কাছ থেকে তাঁরা ডিগ্রি নিতে রাজি নন। শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক নির্দেশিকা জারি করে বিসিআই। তাতে বলা হয়, ২০২৬ সালে নালসার থেকে পাস করা কোনো গ্র্যাজুয়েট দেশের কোনো রাজ্যের বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন না, যতক্ষণ না বিসিআই পরবর্তী নির্দেশ দেয়। এছাড়া ঘটনার তদন্ত করে দোষী শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকদের চিহ্নিত করে রিপোর্ট দিতেও বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে।
বিসিআইয়ের এই নির্দেশের জেরেই তেলাপোকারা জেগে ওঠে। বৃহস্পতিবার রাত আটটায় এক্স হ্যান্ডলে বিসিআইয়ের নির্দেশিকা ট্যাগ করে এক লাইনের পোস্ট করেন অভিজিৎ দিপকে। তাঁর ওই পোস্টটি ছিল বিসিআইয়ের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, যা থেকে বোঝানো হয়েছিল নির্দেশ না তুললে তেলাপোকারা আন্দোলনে নামবে। পরে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, বিসিআই ও তার চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্রর দায়বদ্ধতার হিসাব নেওয়া প্রয়োজন। রাত ১০টায় আরেকটি পোস্টে অভিজিৎ দিপকে বলেন, মনন মিশ্রর ইস্তফা দেওয়ার সময় এসেছে। এই পোস্টের পরেই বিসিআই তাদের নির্দেশিকা প্রত্যাহারের কথা জানায়। তবে সিজেপি জানিয়ে দেয়, বিসিআই নির্দেশ পরিবর্তন করেছে, প্রত্যাহার করেনি; তদন্তের নির্দেশ এখনো বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানায়, মনন মিশ্র শুধু বিসিআইয়ের চেয়ারম্যানই নন, তিনি বিজেপির রাজ্যসভার সদস্যও।
এদিকে শুক্রবার বিসিআইয়ের সমালোচনা করে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার বার কাউন্সিলের নেই। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে ও আইন মেনে প্রতিবাদ বন্ধে আদালত হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি আরও বলেন, বিসিআই যা করেছে তা অনভিপ্রেত। একসময় তিনি নিজেও ছাত্র ছিলেন এবং বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এখানে যা হচ্ছে তা তাঁর ও ছাত্রদের সংলাপ, বিসিআইয়ের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। বিসিআইয়ের নির্দেশিকার বিরুদ্ধে একটি আবেদনে এই মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন, নালসারের কোনো পড়ুয়া বা অধ্যাপকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের একশ্রেণির বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ বলায় নতুন প্রজন্ম ককরোচ জনতা পার্টি গঠন করে। এই মন্তব্য জেন-জিদের জোটবদ্ধ করেছে এবং শাসক দল বিজেপিকেও চাপে ফেলেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তেলাপোকাদের চাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টানা তিন সপ্তাহ সংসদে গরহাজির থেকেছেন। ঝাড়খন্ড সরকারও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তটস্থ। নালসারের ঘটনা তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেট আইনে প্রতিষ্ঠিত বিসিআইয়ের মতো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকা সত্ত্বেও বিজেপি আইন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে বলেও বিতর্কে উঠে আসছে।




