যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ টানা কয়েক মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি রোধে কঠোর কথাবার্তা বলে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই কথার বাস্তবায়নের স্পষ্ট ইঙ্গিত না দেওয়ায় এখন ওয়াল স্ট্রিটে তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। ফেডারেল রিজার্ভ বুধবার নীতিসুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পর বাজারে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি, কারণ বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল নীতির বিষয়টি অনেকটাই অনুমান করেছিলেন। তবে সিদ্ধান্ত-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্শের মন্তব্যের পর ট্রেজারি বাজারে বড় ধরনের ধস নামে এবং বন্ডের সুবাব বৃদ্ধি পায়।
ওয়ার্শ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের’ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যা অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘ফরোয়ার্ড গাইডেন্স’ বা ভবিষ্যৎ সুদের পথ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা বাতিল করার পরিকল্পনা। কিন্তু বুধবার তেমন কোনো স্পষ্ট সংকেত দেননি তিনি। এমনকি মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন সরল প্রশ্নও তিনি এড়িয়ে যান। ফেডারেল রিজার্ভের কার্যকারি পরিবর্তনের বিষয়ে তার আরও কিছু ইঙ্গিত বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পছন্দের মাপকাঠির বাইরে অন্যান্য মুদ্রাস্ফীতিমান পরিমাপক বিবেচনার ইচ্ছার কথা জানান ওয়ার্শ এবং একথাও ইঙ্গিত দেন যে, সুদের হার বাড়ানোর পাশাপাশি ভিন্ন ধরনের কিছু হাতিয়ারও ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান উচ্চ সুয়েদ ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কাজ করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মন্তব্যই বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ব্যাংক অফ অ্যামেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বিষয়ক দলের প্রধান আদিত্য ভাভে এই ঘটনাকে “কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাস্ফীতি বিশ্বাসযোগ্যতার ধাক্কা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বুধবার এক নোটে তিনি মন্তব্য করেন, “বিড়ম্বনার ব্যাপার হলো, আমরা বিশ্বাস করি বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাই সেপ্টেম্বরে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যান্য বিষয় সমান থাকলে।” সহজ ভাষায় বলা যায়, ওয়ার্শের মন্তব্য এতটাই নমনীয় ছিল যা শেষপর্যন্ত কঠোর নীতিই বাধ্যতামূলক করে তুলবে এবং তার সহকর্মী ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি (এফওএমসি) এর সদস্যাদেরই এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।
জেপিমোরগ্যানের অর্থনীতিবিদ মাইকেল ফেরোলি একটি নোটে লিখেছেন, “নতুন চেয়ারম্যানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পছন্দের মুদ্রাস্ফীতির মাপকাঠির বাইরেও তাকানোর কথা বলার বিষয়টি বিশেষভাবে এফওএমসি-র অন্য সদস্যরা ভালোভাবে নেননি। এই সদস্যরাই আমরা বিশ্বাস করি প্রতিষ্ঠানের আদেশ বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ভোট দেবেন।”
ফেডারেল রিজার্ভের জন্য বড় পরীক্ষা আসছে শুক্রবার, যখন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তর মাসিক কর্মসংস্থানর তথ্য প্রকাশ করবে। শ্রমবাজার মজবুত থাকার নতুন কোনও লক্ষণ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ব্যাংক অফ অ্যামেরিকার অর্থনীতিবিদরা বন্ডের ইন্ড কার্ভকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেঅটল প্রতিশ্রুতির একটি নির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদি ওয়াল স্ট্রিট মনে করে যে শিগগিরই সুব হারে বৃদ্ধি আসতে যাচ্ছে, তাহলে স্বল্পমেয়াদি বন্ডের সুব বেড়ে যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের সুব কমে আসবে, কারণ বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করবেন। এই পরিস্থিতিতে মেয়াদ-অনুসারে সুদ হারের ব্যবধান কমে আসে। কিন্তু বাজার যদি ফেডকে বিশ্বাস না করে, তাহলে স্বল্পমেয়াদি সুদ হার কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদ হার বাড়বে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, “ইল্ড কার্ভির চ্যাপ্টা হওয়ার অর্থ হবে বাজার এখনও বিশ্বাস করে যে ফেড তার আদেশ পালনে যা যা লাগে তাই করবে। কিন্তু যদি জোরালো চাকরি ও মুদ্রাস্ফীতির তথ্যের ভিত্তিতে ইল্ড কার্ভের চাল আরও খাড়া হয়ে যায়, তার অর্থ হবে ফেড পরিস্থিতির চেয়ে পিছিয়ে আছে, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন তুলবে।”
অ্যাপোলো গ্লোবালের প্রধান অর্থনীতিবিদ টরস্টেন স্লক একটি নোটে কঠোর বক্তব্যকে বাস্তব পরিকল্পনার সাথে বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছেন। শনিবারের এক নোটে তিনি এক কাল্পনিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা একজন ব্যক্তিকে নিউ ইয়র্ক থেকে লস এঞ্জেলেস নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সমান—যেখানে বলা হচ্ছে না যে যাত্রাটি কত সময় লাগবে, খরচ কত হবে বা কিভাবে সেখানে পৌঁছানো যাবে। এতে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
স্লক আরও যোগ করেছেন, “ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা থেকে সরে আসার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ইল্ড কার্ভ আরও খাড়া হয়ে যাওয়া, যেখানে বিনিয়োগকারীরা সামনের যাত্রা নিয়ে আরও প্রশ্ন করতে শুরু করবে। আর ঠিক এটাই আমরা বিবৃতি আসার পর থেকে দেখতে পেয়েছি। মূল কথা হল ফেডের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য শুধু নির্দিষ্ট লক্ষ্য বলা নয়, সেই লক্ষ্য অর্জনের উপায়টিও ব্যাখ্যা করা গুরুত্বপূর্ণ।”




