রাজধানীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। রোগী শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাড়ি এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় গিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে ডিএনসিসি। এই লক্ষ্যে যেসব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তির হার বেশি, সেগুলো থেকে নিয়মিত রোগীর তালিকা সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মীদের। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর প্রাথমিক পর্যায়েই নজরদারি ও সমন্বয়ের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।

গত ১৭ আগস্ট শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানিয়া আক্তার ও আমিনুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তারা ফোন ধরেননি। আরেক কর্মী নুর হায়াতের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোর নার্সরা জানিয়েছেন, ৪২০ নম্বর ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সর্বশেষ ৯ ও ১০ আগস্ট দেখা গেছে, অপরদিকে ৪২২ নম্বর ওয়ার্ডে ১২ ও ১৩ আগস্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৬ ও ১৭ আগস্ট কেউ তথ্য নিতে আসেননি বলে জানান নার্সিং ইনচার্জ ফাতেমা শিকদার। একই দিন শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালেও দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন কর্মীকে পাওয়া যায়নি। পরে যোগাযোগ করা হলে রাকিবুল ইসলাম জানান, তিনি তখন মশা নিধন কাজে ব্যস্ত ছিলেন এবং দুপুরের পর হাসপাতালে যাওয়ার কথা। তিনি স্বীকার করেন, ১৭ আগস্টই তার প্রথম হাসপাতালে তথ্য সংগ্রহে আসা। এর আগে অন্য কেউ তথ্য নিয়েছেন কি না, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন।

পরদিন ১৮ আগস্টও দুটি হাসপাতালেই দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহকারী তানিয়া আক্তার জানান, ১৭ আগস্ট সকালে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার জরুরি সভার কারণে তারা হাসপাতালে যেতে পারেননি। তবে ১৪ ও ১৫ আগস্ট তারা তথ্য সংগ্রহ করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, ১ আগস্ট থেকে ১০টি নির্বাচিত হাসপাতালে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত চারটি হাসপাতালে কার্যক্রম চালু আছে। তিনি সমন্বয় ও নজরদারির কিছু ঘাটতির কথা স্বীকার করে বলেন, বিশেষায়িত জনবলের অভাবে প্রাথমিক সমস্যা হচ্ছে এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিষয়টি গুছিয়ে নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ডিএসসিসি তাদের মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকির জন্য ১০টি অঞ্চলে কমিটি গঠন করলেও সেখানেও নিয়মিত তদারকি হচ্ছে না। অঞ্চল-৬-এর কমিটির আহ্বায়ক হাসিবা খান জানান, তার নিজস্ব দায়িত্ব থাকায় প্রতিদিন মাঠে যাওয়া সম্ভব হয় না, তবে কমিটির অন্য সদস্যরা নিয়মিত কাজ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক অঞ্চলের এক সদস্য জানান, কমিটি গঠনের পর কিছুদিন কাজ হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। অঞ্চল-৫-এর তদারকি কমিটির আহ্বায়ক পদটি প্রায় দুই মাস ধরে খালি থাকলেও সেখানে বিকল্প কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩১০ জন, যা ১৮ আগস্টের মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জনে। এই ১৮ দিনে আক্রান্তের হার বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫৪ থেকে বেড়ে ৭৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে (২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬) মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন মোট ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যার মধ্যে ডিএনসিসির অংশ ৪০৯ কোটি এবং ডিএসসিসির ১৯৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসি ২০৮ কোটি এবং ডিএসসিসি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ডিএনসিসি ২০২০ সাল থেকে ‘নোভালিউরন’ ব্যবহার করলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি আছে। ফগিং পদ্ধতিকে ভুল ও অর্থের অপচয় বলে সমালোচনা করা হলেও দুই সিটিই এখনো এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এছাড়া বিটিআই আমদানিতে জালিয়াতির ঘটনায় এক ঠিকাদারকে কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ওই কালোতালিকাভুক্ত ঠিকাদার মিজানুর রহমান খানের নতুন প্রতিষ্ঠান এখন ডিএসসিসিতে মশার ওষুধ সরবরাহ করছে বলে জানা গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেছেন, শুধু ডেঙ্গু রোগীর হটস্পট চিহ্নিত করলেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থলের তথ্যের ভিত্তিতে উৎস ধ্বংস এবং প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে, অন্যথায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।