ম্যাসাচুসেটসের ডাক্সবেরিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নিজের তিন সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে বিচারাধীন লিন্ডসে ক্ল্যান্সির ফোনের ডেটা বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থাপিত এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের বেশ কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তিনি হ্যালুসিনেশন, সাইকোসিস এবং নিজের নির্ধারিত বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে অনলাইনে বারবার খোঁজ করছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে তিনি আত্মহত্যার পদ্ধতি, বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং অনিদ্রা সম্পর্কেও তথ্য অনুসন্ধান করেন। জানুয়ারিতে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা নিয়েও তিনি ইন্টারনেটে গবেষণা করেন।

আদালতে আরও জানানো হয়, ২০২২ সালের অক্টোবরে ক্ল্যান্সি একটি দীর্ঘ নোট লেখেন, যেখানে তিনি নিজের সন্তান লালন-পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আট মাস বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি দ্বিধায় ছিলেন এবং চতুর্থ সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও পুনর্বিবেচনা করছিলেন। ওই নোটে ৩৬ বছর বয়সী এই সাবেক নার্স তার প্রথম দুই সন্তানের তুলনায় কনিষ্ঠ সন্তানকে একই রকম যত্ন দিতে না পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছিলেন, “আমার সন্তানদের কিছু ঘটে যাওয়ার বা তাদের বিকাশ নষ্ট করার মতো কোনো ভুল করার ভয় পাই। আমাদের প্রজন্ম প্রতিটি বিষয়ে তথ্যে ডুবে আছে... এটা অস্বাস্থ্যকর। গত পাঁচ বছর ধরে আমি শুধু সন্তান লালন-পালন নিয়েই ভেবেছি।”

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি লিন্ডসে তার স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সিকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তিনি ফোনে স্বামীকে খাবার আনতে এবং ফার্মেসিতে যেতে বলেন। এরপর তিনি তাদের তিন সন্তান— ৫ বছর বয়সী কোরাসহ তিন সন্তানকে ব্যায়ামের রাবার ব্যান্ড দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। বাড়ি ফিরে প্যাট্রিক বেসমেন্টে শিশুদের মৃত অবস্থায় পান। লিন্ডসে তখন বাড়ির উঠোনে পড়েছিলেন, দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দেওয়ার পর তার কোমরের নিচ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

আদালতে ম্যাসাচুসেটস রাজ্য পুলিশের ফোন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ টিম চিয়াপিনি হত্যার দিন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিনিময় হওয়া টেক্সট বার্তাগুলো পড়ে শোনান। বার্তাগুলোতে তারা একে অপরের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন এবং লিন্ডসে তাদের একটি সন্তানের কিডনি সুস্থ থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন। শিশুদের ছবিও বার্তায় আদান-প্রদান হয়। প্যাট্রিক তাকে লেখেন, “তুমি একজন ভালো মা।” জবাবে লিন্ডসে হৃদয় ও হাসির ইমোজি পাঠান।

ক্ল্যান্সির আইনজীবীরা স্বীকার করেছেন যে তিনি সন্তানদের হত্যা করেছেন, তবে তারা দাবি করছেন, তিনি বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং প্রসবোত্তর সাইকোসিসে ভুগছিলেন— একটি বিরল অবস্থা যা প্রসবের পর নারীর বাস্তবতা উপলব্ধি পরিবর্তন করে দিতে পারে। তাদের বক্তব্য, তিনি কণ্ঠস্বর শুনতে পেতেন যা তাকে সন্তানদের এবং নিজের জীবন নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিল। অন্যদিকে, প্রসিকিউশন দাবি করছে, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেছেন এবং স্বামীকে বাড়ি থেকে সরানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রসিকিউটর শানান বাকিংহাম জুরিদের বলেছেন, এই মামলাকে “নারীর মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে জনসাধারণের বিতর্ক” হিসেবে দেখা উচিত নয়।

আইনজীবীরা আরও জানান, ক্ল্যান্সি তার অবস্থার উন্নতির জন্য সব চেষ্টা করেছিলেন— একাধিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, বিভিন্ন ওষুধ খেয়েছিলেন, একটি আত্মহত্যা হটলাইনে ফোন করেছিলেন, জরুরি বিভাগে গিয়েছিলেন এবং প্রসবোত্তর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের জন্য একটি হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা কর্মসূচিতে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন কিন্তু গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি তিনি কয়েকদিনের জন্য একটি মানসিক হাসপাতালেও নিজেকে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতির বদলে অবনতি ঘটে। অন্যদিকে, প্রসিকিউশন দেখানোর চেষ্টা করছে যে ক্ল্যান্সির মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি চিকিৎসকদের পরামর্শ উপেক্ষা করে কিছু ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তার চিকিৎসকরা সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি নিজের বা সন্তানদের ক্ষতি করার পরিকল্পনার কথা কখনো বলেননি, যদিও তিনি আত্মহত্যার চিন্তার কথা স্বীকার করেছিলেন।

ক্ল্যান্সি দোষী প্রমাণিত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। তবে আদালত যদি তাকে ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি দেয়, তাহলে তাকে রাজ্যের মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হবে। এই মামলার সরাসরি সম্প্রচার চলছে এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।