বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি ওপেনএআই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান সম্প্রতি ফরচুন ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কোম্পানির ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং নিজের দায়িত্ববোধ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। নিউইয়র্কের সোহো পাক বিল্ডিংয়ে ওপেনএআই-এর কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়। সেখানে ব্রকম্যানের স্ত্রী তাকে সমর্থন জানাতে উপস্থিত ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে হাগিং ফেসে ওপেনএআই-এর এলএলএম মডেলের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রসঙ্গে ব্রকম্যান বলেন, ঘটনাটি নির্দিষ্ট নয়, বরং মডেলগুলোর সাধারণ সক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা করা জরুরি। তিনি জানান, ওপেনএআই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে চায় এবং এ জন্য মডেলগুলোকে আরও সহজলভ্য করার পাশাপাশি মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পুরো শিল্প একত্রিত হয়ে কাজ করবে, কারণ সবার স্বার্থ একই সূত্রে গাঁথা।
ব্রকম্যান আরও বলেন, ওপেনএআই নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে। চেইন-অফ-থট মনিটরিংয়ের মতো পদ্ধতি তারা শুরু থেকেই ব্যবহার করছে, যেখানে মডেলকে যৌক্তিক আউটপুট দিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে তারা কখনই এমন পথে হাঁটেনি যেখানে বিশ্বস্ততা বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র ভালো দেখানো উত্তর তৈরি করা হয়। তিনি দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তে ওপেনএআই শিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সরকারের সঙ্গে এআই কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক প্রসঙ্গে ব্রকম্যান ডেমিস হাসাবিসের ফিনরা-সদৃশ তদারকি সংস্থার প্রস্তাবকে সমর্থন জানান। তাঁর মতে, উদ্ভাবন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে এমন একটি কাঠামো কার্যকর হতে পারে। তিনি বলেন, ‘অনিশ্চয়তা থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভালো সমন্বয় ও তদারকি থাকলে উদ্ভাবন থেমে থাকে না।’
চীনা ওপেন সোর্স মডেলের প্রসঙ্গে ব্রকম্যান নিজের মতামত দেন। তিনি বলেন, ওপেনএআই শুরু থেকেই বিশ্বাস করে পৃথিবীতে আরও এআই থাকা উচিত এবং মানুষকে ক্ষমতায়িত করা উচিত। তবে ডিস্টিলেশন প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। একটি ফ্রন্টিয়ার মডেলের সমান সক্ষমতা অর্জন করতে একই আকারের কম্পিউট প্রয়োজন, যা খুব কঠিন। নীতি নির্ধারণের সময় প্রযুক্তিগত বাস্তবতা মাথায় রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
কোন কাজটি তাঁকে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে জানতে চাইলে ব্রকম্যান বলেন, ‘প্রভাবই সবকিছু।’ তিনি স্ট্রাইপে কাজ করার সময় থেকে এআইকে সবচেয়ে রূপান্তরকারী প্রযুক্তি হিসেবে দেখেছেন। জাপানের এক কৃষকের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যিনি কোডেক্স ব্যবহার করে তার খামার স্বয়ংক্রিয় করেছেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও এআই বড় পরিবর্তন আনছে। চ্যাটজিপিটিতে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ফিচার চালু হয়েছে, যেখানে একজন বন্ধু হাসপাতালে চিকিৎসকের ভুল এড়াতে পেরেছিলেন।
শারীরিক এআই ও হার্ডওয়্যার ডিভাইস প্রসঙ্গে ব্রকম্যান বলেন, এখনই সে বিষয়ে কিছু বলার সময় নয়। তবে ভবিষ্যতে ডিভাইসের ধারণা পুরোপুরি বদলে যাবে। ইন্টারফেসকে আরও সরল করা তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘চ্যাটজিপিটির বর্তমান ইন্টারফেস অনেক জটিল। আমরা চাই সব জটিলতা দূর করে এমন একটি মাধ্যম তৈরি করতে যা মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে।’
পণ্য সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয় জানতে চাইলে ব্রকম্যান বলেন, ওপেনএআই-এ নিচ থেকে ওপরের দিকের সংস্কৃতি বিদ্যমান। কোডেক্সের মতো কিছু পণ্য ছোট একটি গ্রুপের উদ্যোগ থেকে এসেছে, আবার এপিআই পুরোপুরি ওপর থেকে নির্ধারিত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পণ্যের সংস্কৃতি ঢোকানো সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল।’
টেকসই ব্যবসায়িক মডেল প্রসঙ্গে ব্রকম্যান দুই ভাগে ভাগ করেন। প্রথমত, যদি মডেলের সক্ষমতা আজ থেকেই জমে যায়, তবুও চ্যাটজিপিটির প্রায় এক বিলিয়ন ব্যবহারকারীকে আরও বেশি মূল্য দেওয়ার সুযোগ আছে। এন্টারপ্রাইজ খাতে তারা গতি পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মডেলের অগ্রগতি থেমে থাকার সম্ভাবনা নেই। ‘এআই এখনো অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান করতে পারবে। গণিত, রসায়ন, বিজ্ঞানে আমরা তার স্বাদ পাচ্ছি।’
পরিশেষে ব্যক্তিগত চাপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার স্ত্রী ছাড়া আমি এটা করতে পারতাম না। আমি তার ওপর অনেক বেশি নির্ভর করি।’ তিনি সাইক্লিংয়ের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন: ‘কখনো সহজ হয় না; তুমি শুধু দ্রুত যাও।’ তিনি বলেন, ‘মিশন সফলভাবে শেষ হলে এবং সবাই এআই থেকে উপকৃত হলে একদিন আরাম করে ছুটি কাটানো যাবে। ততদিন মাথা নিচু করে কাজ করে যেতে হবে।’




