চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রকল্পে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সোমবার দুপুরে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তথ্য দেন।

মন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এই বিনিয়োগ ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য অর্জনে একটি মাইলফলক। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ কেবল আনোয়ারা নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী অতীতের অর্থনৈতিক অবস্থাকে 'ভয়াবহ বিপর্যস্ত' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকার টাকা ছাপানোর মাধ্যমে অর্থনীতি চালানোর চেষ্টা করেছিল, যা টেকসই নয়।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর করে তোলা। বিনিয়োগের মাধ্যমেই দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছাতে বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে জনগণের সম্পদ বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পেয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বক্তব্যে দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিনিয়োগ সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারায় শুধু একটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে না, বরং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় সূচিত হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় গৃহীত উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে প্রকল্পটিকে অভিহিত করেন।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান এবং চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থায়নসংক্রান্ত নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রায় ৮০০ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করেছে এই শিল্পাঞ্চল। প্রকল্পটির সূচনা বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) উদ্যোগের মাধ্যমে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। ওই বছর দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতায় উদ্যোগটি থমকে যায়। পরে চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা হলেও ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়নি। ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে মনোনীত করে চীন সরকার। তবে সরকারি ক্রয়নীতি অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেভেলপার—দুই ভূমিকায় কাজ করতে না পারায় আবারও জটিলতা তৈরি হয়। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি বিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি নতুন গতি পায়।