শেয়ারবাজারের সুস্থতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার স্বার্থে ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক রাখার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ ইকবাল হাসান। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের বদলে অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন চালুর যে প্রস্তাব, তাকে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।
তার মতে, একটি গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি হলো নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক তথ্যপ্রবাহ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো থেকে নিয়মিত আর্থিক তথ্য না পেলে বাজার পরিণত হয় গুঞ্জন ও ফাটকাবাজির কেন্দ্রে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এই প্রস্তাবের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর আইনি জটিলতা বা কমপ্লায়েন্সের চাপ কমানোর কথা ভাবলেও, বাজারে এর কুপ্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা, বাজারে প্রতিযোগিতার সাম্য নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা টিকিয়ে রাখতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আর্থিক তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি জোর দেন।
আহমদ ইকবাল হাসান ব্যাখ্যা করেন, ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজি প্রতিহত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো এই ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন। 'অসম তথ্য তত্ত্ব'-এর বাস্তবতা হলো, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও বড় বিনিয়োগকারীরা সব সময়ই সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের তুলনায় বেশি ও দ্রুত তথ্য পান। তিন মাসের প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করে তথ্যের এই অসমতা কমায়। প্রকাশের এই মেয়াদ তিন থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হলে, বাজারে একটি ১৮০ দিনব্যাপী তথ্যশূন্যতা তৈরি হবে। এই দীর্ঘ ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা 'ইনসাইডার ট্রেডিং'-এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, কোনো কোম্পানির আয় হঠাৎ কমে গেলে বা বড় লোকসান হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেটি মাসের পর মাস অজানা থাকবেন, কিন্তু ভেতরের লোকেরা আগেভাগে শেয়ার বিক্রি করে সরে দাঁড়াবেন। এছাড়া, এত দীর্ঘ তথ্যহীনতায় স্টক এক্সচেঞ্জের স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা কাজ করবে না, ফলে শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান কারসাজি নাকি প্রকৃত উন্নতির ফল, তা বোঝা যাবে না।
বৈশ্বিক মানদণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের মতো শক্তিশালী বাজারগুলিতে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক। ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ভারতের সেবি বা চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিটি নির্দিষ্ট মেয়াদের ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের কড়া নিয়ম করে। তারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে, শেয়ারের দামে কৃত্রিম হেরফের ও তথ্য লুকানোর বিরুদ্ধে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদনই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচ।
কমপ্লায়েন্সের বোঝা কমানোর যুক্তিকে পুঁজিবাজারের মৌলিক দর্শনের ভুল ব্যাখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন সাবেক ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি মনে করেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সাধারণ জনগণের কাছ থেকে কম খরচে পুঁজি সংগ্রহের বিনিময়ে গোপনীয়তার পরিহার করে চলমান কমপ্লায়েন্স, মূল্য-সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ ও কঠোর আর্থিক প্রতিবেদন জমার বাধ্যবাধকতা নিয়েছে। ত্রৈমাসিক ফাইলিং তুলে দেওয়া হলে, বাংলাদেশ যদি স্বেচ্ছায় অর্ধবার্ষিক মডেলে ফিরে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। তারা ভাববে, বৈশ্বিক মান অর্জনের বদলে দেশটি সুশাসনের নিয়ম শিথিল করছে, যার ফলে তাদের বিনিয়োগের উৎসাহ কমে যাবে।
তিনি পরামর্শ দেন, হিসাব তৈরির প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও সহজ করে তুলতে হবে, কিন্তু তথ্যের ধারা বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বিএস ইসি-র মূল দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা, করপোরেট ব্যবস্থাপনার কাজের চাপ কমানো নয়। একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়তে হলে ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন অব্যশই ধরে রাখতে হবে।




