চীনা চিপ প্রস্তুতকারক চ্যাংজিন মেমোরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) কার্যত একরাতেই দেশটির সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। গত সোমবার (২৭ জুলাই) সাংহাই বাজারে তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির শেয়ারমূল্য ৫০০ শতাংশের ঊর্ধ্বে লাফিয়ে ওঠে এবং সপ্তাহজুড়ে তা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। শুক্রবার ৮.৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতিটি শেয়ার ৫৭.৬০ ইয়েনে (৮.৫০ ডলার) লেনদেন হয়। সপ্তাহের শেষে সিএক্সএমটির বাজার মূলধন পৌঁছে ৩.৫৪ ট্রিলিয়ন ইয়েনে (৫২৩ বিলিয়ন ডলার), যা আগের শীর্ষস্থানী ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়নাকে ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্লেষকরা এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন। কেউ কেউ এটিকে এআই-চালিত মেমোরি সংকটের কারণে একটি সাময়িক ঊত্থান হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ বিশ্বব্যাপী এআই সাপ্লাই চেইনে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, যেখানে চীনা চিপ্রনির্মাতারা অগ্রভাগে আসছে। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির গবেষণা সহযোগী বারবোরা ভ্যালোকোভা মন্তব্য করেন, চীন স্পষ্টতই একটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ মেমোরি চিপ্র অভিনেতা হয়ে উঠছে, তবে এটি এমন এক বাজারে ঘটছে যা এআই চাহিদা, সরবরাহ ঘাটতি এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত শিল্পনীতির মাধ্যমে বিকৃত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এর অর্থ এই নয় যে চীন সম্পূর্ণ চিপ্র সারিতে নেতৃস্থানীয়দের দ্রুত ধরে ফেলছে।
ভ্যালোকোভার মতামত অনুসারে, যদিও সরবরাহ স্বল্পতা কোম্পানিগুলোকে চীনা চিপ্র সরবরাহ অন্বেষণে বাধ্য করছে, তবুও গ্রহণযোগ্যতা এখনও বাছাইকৃত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। ৩০ জুলাই ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকান জিম ব্যাংকস ও নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাট চাক শুমারের নেতৃত্বে একদল মার্কিন আইনপ্রণেতা অ্যাপলের সিইও টিম কুককে চিঠি দেন, যেখানে তাকে ‘কালোতালিকাভুক্ত’ চীনা সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহকারী যেমন সিএক্সএমটি ও ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস কোরপোরেশন (ওয়াইএমটিসি) থেকে চিপ্র কেনার যেকোনো প্রচেষ্টা পরিত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়। সিনেটররা লেখেন, এ ধরনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত একটি ভুল হবে এবং এটি নিশ্চিত করবে যে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে যাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চীনা সামরিক কোম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অ্যাপল পূর্বে বিশ্বব্যাপী মেমোরি সরবরাহ সংকটের সাথে লড়াই করতে গিয়ে উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই চিপ কিনতে আলোচনায় লিপ্ত ছিল, যা পণ্যের দাম আকাশচুম্বী করে তুলেছে। গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এক আয় সংক্রান্ত আলোচনাকলে টিম কর্ বলেন, তারা বর্তমানে সরবরাহ শৃঙ্খলে সীমিত নমনীয়তার সাথে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা প্রত্যক্ষ করছেন। তিনি পরিস্থিতিকে মেমোরির দামে শতাব্দীর বন্যা হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে মেমোরির দাম সূচকীয় হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্য বিশেষজ্ঞরা, যেমন সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইস্ট এশিয়ান ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ফেলো কং তুয়ান ইউয়েন, যুক্তি দেন যে মেমোরি ঘাটতি চীনা চিপ্রগুলির চাহিদা বাড়ালেও, বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক কোম্পানি সিএক্সএমটি-কে শুধুমাত্র একটি দ্বিতীয় স্তরের উৎস হিসেবেই বিবেচনা করবে। তার ভাষ্যে, কোম্পানিগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল বিচিত্রায়িত করা প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তারা দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত একাধিক সরবরাহ উৎস বজায় রাখবে। ফিউচারামের সেমিক্রিন্ডাক্টর ও অবকাঠামো ইকুইটি গবেষণা প্রধান রল্ফ বাল্ক সিএনবিসিকে বলেন, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সম্ভবত এসকে হাইনিক্স, মাইক্রোন বা স্যামসাং চিপকে তাদের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করবে, কারণ সিএক্সএমটির চিপ নির্মাণে এখনও অধিক ব্যয় হয়। বাল্কের মতে, চিপ্রের কর্মক্ষমতার দিক থেকে সিএক্সএমটি এখনও এসকে হাইনিক্স, স্যামসাং ও মাইক্রনের চেয়ে দুই থেকে তিন প্রজন্ম পিছিয়ে। ফলে প্রতিটি চিপ উৎপাদনে তাদের বিট প্রতি ২০% থেকে ৩০% বেশি খরচ করতে হয়।
বিশ্বব্যাপী চিপ্রনির্মাতা প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধসে পড়েছে। যদিও চীনা চিপ্রনির্মাতারা অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে কয়েক প্রজন্ম পিছিয়ে, সাম্প্রতিক চীনা এআই ক্ষেত্রের অগ্রগতি, যার মধ্যে সিএমএমটির চমকপ্রদ আত্মপ্রকাশ ও মুনশটের কিমি কে৩ প্রকাশ অন্তর্ভুক্ত, তা বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে রেখাপাত করেছে। এআই চিপ্র জায়ান্ট এনভিডিয়ার শেয়ার সোমবার ৫% পড়ে যায়, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাং উভয়ই ১৩% এর বেশি পতনের মুখে পড়ে। (তবে, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের শক্তিশালী আয়ের খবরে এআই ব্যয়ের প্রতি আস্থা ফিরে আসায় সপ্তাহের শেষে সেমিক্রিন্টাক্টর শেয়ার পুনরুদ্ধার হয়।)
এনইউএস ইস্ট এশিয়ান আইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলাে চেন গ্যাংয়ের মতেন, এই গতিশীলতা চীনা চিপ্র নির্মাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে। তিনি বলেন, চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারীদের ধরে ফেলতে যে গতি অর্জন করতে পারে, তা আমাদের অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। সিএমএমটি ও ইয়ংজি টেকনোলজিসের মতো কোম্পানিগুলো তাদের বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে দ্রুত উৎপাদন ও গবেষণার পরিধি প্রসারিত করতে চীনের বিশাল পুঁজিবাজার ও সরকারি সহায়তাকে কাজে লাগাতে পারে।
গত সোমবার দি ইনফরমেশন প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, একটি অজ্ঞাত চীনা কোম্পানি একটি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি (ডিইউভি) যন্ত্র তৈরি শুরু করেছে। এই যন্ত্রগুলো সিলিকন ওয়েফারে সার্কিট প্যাটার্ন খোদাই করে, যা সেমিক্রিন্টাক্টর উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং প্রাথমিকভাবে ওলন্দাজ প্রস্তুতকারক এএসএমএল তৈরি করে। নিজস্ব সেমিক্রিন্টাক্টর শিল্প গড়ে তোলার বিস্তৃত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চীন দীর্ঘকাল ধরেই একটি প্রতিযোগিতামূলক লিথোগ্রাফি যন্ত্র তৈরি করতে চাইছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে চিপ ও চিপ্র তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানি নিষিদ্ধ করে মার্কিন নিয়ন্ত্রণপূণের প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান আরও জোরালো হয়েছে। এনইউস-এর কং উপসংহারে বলেন, সরকার-নেতৃত্বাধীন এআই বিনিয়োগ, স্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে দেশি মেমোরি সরবরাহী ব্যবহারের নির্দেশ এবং অ্যাপলের মতো বিদেশি সংস্থার ক্রমবর্ধমান চাহিদার সমন্বয় একটি স্ব-শক্তিশালী চক্র তৈরি করবে, যা চীনা চিপ্র কোম্পানিগুলোকে সেমিক্রিন্টাক্টর মূল্য শৃঙ্খলে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে ভূরাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব সর্বদা বোঝা হয়ে থাকবে। অপরদিকে, বিনিয়োগকারীরা চীনের সেমিক্রিন্টাক্টর খাতায় বাজি ধরার আরেকটি সুযোগ পেতে যাচ্ছে। ইয়ংজি মেমোরি টেকনোলজিস কর্পোরেশন (ওয়াইএমটিসি) বর্তমানে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির জন্য প্রাক-আইপিও প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
মূল প্রতিবেদনটি ফরচুন.কমে প্রকাশিত হয়েছিল।



