খন্দকার সুমনের মতে, মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের 'বনলতা সেন' প্রচলিত বায়োপিকের ধারায় পড়ে না। এটি জীবনানন্দ দাশের জীবনী নয়, বরং তার মানসলোক, স্মৃতি ও অবচেতনের সিনেমাটিক রূপ। বাস্তব ও পরাবাস্তব এখানে পাশাপাশি চলে, ইতিহাস ও কল্পনা একে অপরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। চলচ্চিত্রটি কবির কাব্যচেতনাকে দৃশ্যের ভাষায় অনুবাদ করার উচ্চাভিলাষী প্রয়াস বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো 'মহিন' চরিত্র। খন্দকার সুমনের কাছে মহিন জীবনানন্দের দ্বিতীয় সত্তা—যে বাস্তবে নেই, কিন্তু কবির ভেতরে চিরকাল বেঁচে আছে। তিনি কবির নিভৃত আত্মা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও অনন্ত পথচলার প্রতীক। এই ধারণা চিত্রনাট্যকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তবে চিত্রনাট্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দর্শকের ওপর পুরোপুরি আস্থা না রাখা। মহিনের মুখে 'আমি এখনো জন্মাইনি' বা অনুরূপ ব্যাখ্যামূলক সংলাপগুলো যেন নিজেই নিজের টীকা লিখছে। লেখকের মতে, একজন নির্মাতা যখন দর্শকের ওপর ভরসা করেন, তখন নীরবতাই কথা বলে। একটি অসম্পূর্ণ দৃশ্য বা প্রতীক দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে বেশি অর্থ বহন করে। 'বনলতা সেন' আরও নীরবতা দাবি করছিল বলে তিনি মনে করেন।

ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভিজ্যুয়াল নির্মাণ। আলো ও অন্ধকারের বিন্যাস, রঙের সংযম, স্থাপত্যের ব্যবহার, পোশাক ও লোকজ উপাদান মিলিয়ে এক নান্দনিকতা তৈরি হয়েছে যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল। অনেক দৃশ্য মনে হয়েছে যেন কোনো ধ্রুপদি ক্যানভাস জীবন্ত হয়ে উঠছে। একটি খালি ঘর, জানালা, কুয়াশাঢাকা পথ বা দীর্ঘ করিডরও চরিত্রে পরিণত হয়েছে। তবে ট্রলি ট্র্যাকিং শটের পুনরাবৃত্তি ছবির ছন্দে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন খন্দকার সুমন। প্রতিটি ভাষারই ছন্দ আছে, একটি ক্যামেরা মুভমেন্ট অতিরিক্ত ব্যবহারে নিজের শক্তি হারায়।

নারী চরিত্রের নির্মাণ নিয়েও আপত্তি রয়েছে তাঁর। যেহেতু চলচ্চিত্রটি একজন পুরুষ কবির মনস্তত্ত্বকে কেন্দ্র করে, নারী চরিত্রগুলো তার দৃষ্টির মাধ্যমেই আসে। কিন্তু সেই দৃষ্টিই যখন একমাত্র হয়ে ওঠে, তখন সমস্যা তৈরি হয়। বনলতা, লাবণ্য বা অন্য নারী চরিত্রগুলো নিজস্ব অভিজ্ঞতার মানুষ নয়, বরং পুরুষ চরিত্রের মানসিক যাত্রার অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। লাবণ্য দাশের চরিত্র আরও গভীর হওয়ার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে চাকরি হারানোর সংবাদে তার আবেগের প্রকাশ দৃশ্যটি নাটকীয়তার প্রয়োজন থেকে নির্মিত বলে মনে হয়েছে। কুসুমকুমারী দাশের উপস্থিতিও মূল আবেগপ্রবাহকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যায়, তা স্পষ্ট নয়।

অভিনয়ের ক্ষেত্রেও মঞ্চাভিনয়ের ছাপ লক্ষ করেছেন তিনি। ক্যামেরা মানুষের মুখের খুব কাছে যায়, সেখানে ক্ষুদ্রতম অভিব্যক্তিও দীর্ঘ সংলাপের সমান শক্তিশালী। কিছু দৃশ্যে অভিনয় আরও সংযত হলে আবেগ আরও গভীর হতে পারত। তবে শব্দ নির্মাণ নিয়ে আলাদা করে প্রশংসা করেছেন খন্দকার সুমন। শব্দ, নীরবতা ও আবহসংগীতের ব্যবহারে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিরল।

সবশেষে তিনি বলেছেন, 'বনলতা সেন'কে নিখুঁত চলচ্চিত্র বলা যাবে না। সংলাপ আরও সংযত হতে পারত, কিছু চরিত্র আরও গভীর হতে পারত, কিছু দৃশ্য আরও সংক্ষিপ্ত হতে পারত। কিন্তু শিল্পের মূল্যায়ন কেবল সীমাবদ্ধতা দিয়ে হয় না, হয় তার সাহস দিয়েও। যে সময়ে অধিকাংশ চলচ্চিত্র নিরাপদ গল্প বলার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সে সময় এই ছবি কবিতাকে চলচ্চিত্রে অনুবাদ করার ঝুঁকি নিয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়, অনুভূতি নির্মাণের শিল্প। চলচ্চিত্রটি শেষ হওয়ার পরও অনেক দৃশ্য মনে থেকে যায়, অথচ কাহিনি নয়—একটি চলচ্চিত্রের জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে?