বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক জরিপে দেশের শিল্প ও বিনোদন খাতের বিভিন্ন উপখাতে আয়ের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য ধরা পড়েছে। সমীক্ষাটি ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল এই খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও অবদান মূল্যায়ন করা।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ উপার্জন এসেছে সার্কাস, অর্কেস্ট্রা ও ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ২২ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থানগুলো, যারা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ১৯ কোটির বেশি টাকা আয় করেছে। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা, উদ্ভিদ উদ্যান, সরকারি-বেসরকারি স্পোর্টস ক্লাব ও বিনোদন পার্কগুলোর আয় ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, নাটক, গান, কনসার্ট, নৃত্য ও অপেরার মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের আর্থিক রিটার্ন তুলনামূলকভাবে নগণ্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ছিল মাত্র ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। বিবিএস জানিয়েছে, আগে কখনো এই খাতগুলো নিয়ে এ ধরনের সমীক্ষা করা হয়নি। জিডিপিতে শিল্প ও বিনোদন খাতের অবদান বর্তমানে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও কর্মসংস্থানের দিকটিও জরিপে উঠে এসেছে। অংশ নেওয়া ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৭টি সরকারি মালিকানাধীন, ৭৫টি একক মালিকানার, ৫০টি অংশীদারত্বের এবং ২০টি পারিবারিক অংশীদারির। মালিকদের ৯০ শতাংশই পুরুষ, যা খাতে নারী নেতৃত্বের অভাবকে নির্দেশ করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কর্মসংস্থান ৬ হাজারের কিছু বেশি।

ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ই সবচেয়ে বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর্মীদের বেতনে খরচ হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ, গ্যাস, শিল্পী সম্মানী, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা, ভাড়া প্রভৃতি খাতে আরও ২৬-২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। মোট আয় ৫৫ কোটি টাকা হলেও ব্যয় বেশি থাকায় সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিএস। তাদের মতে, জাদুঘর, পার্ক, লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান সরকারি তহবিল পায় এবং টিকিট মূল্যে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে আয় কম হয়।

সৃজনশীল খাতের এই অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরকারি ও বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার বড় ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এ খাত থেকে আর্থিকভাবে দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি ভারত ও কোরিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, এই দেশগুলো কয়েক দশক ধরে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমেই আজ সৃজনশীল অর্থনীতিতে সফল। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আর্থিক মূল্যের চেয়ে জাতিগত ও সামাজিক মূল্য সংযোজন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে সাংস্কৃতিক পর্যটন উন্নয়ন, জাতীয় ও আঞ্চলিক উৎসবের ক্যালেন্ডার তৈরির পরিকল্পনার কথাও বলেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অর্থনীতিতে বিনোদন খাতের অবদান আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তার জন্য প্রয়োজন টেকসই সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও নীতি সহায়তা।