জ্যামিতির জগতে আকৃতির জটিলতা নয়, বরং সঠিক তথ্য গণনাই কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে — এই শিক্ষাই দেয় পিকের সূত্র। গ্রাফ পেপারের ছোট ছোট বর্গক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সমীকরণ বহুভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে একটি অভূতপূর্ব সরল পথ দেখায়।
আগের পর্বে রাতুল জেনেছিল যে, কোনো বহুভুজের ক্ষেত্রফল A = I + B/2 − 1 সূত্রে পাওয়া যায়। এখানে I হলো বহুভুজের ভেতরে থাকা গ্রাফের বিন্দুর সংখ্যা, আর B হলো সীমানার ওপর অবস্থিত বিন্দুর সংখ্যা। কিন্তু কেন এই সূত্রটি কার্যকর — সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গণিত ভাইয়ার সঙ্গে তার আলোচনা এগিয়ে যায়।
গণিত ভাইয়া ব্যাখ্যা করেন, গ্রাফ পেপারে পাশাপাশি চারটি বিন্দু মিলে একটি ছোট বর্গ তৈরি করে, যার ক্ষেত্রফল এক বর্গ একক। এই বর্গকে কোনাকুনি কাটলে দুটি সমান ত্রিভুজ পাওয়া যায়; ফলে প্রতিটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল হয় অর্ধেক বর্গ একক। একটি বড় বহুভুজকে এমন অনেক ছোট ত্রিভুজে ভাগ করা সম্ভব। সব ছোট অংশের ক্ষেত্রফল যোগ করলে পুরো বহুভুজের ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়।
ভেতরের একটি গ্রাফ বিন্দুর চারপাশের সম্পূর্ণ জায়গাই বহুভুজের অন্তর্গত। ছোট ত্রিভুজগুলো সেই বিন্দুর চারদিকে একটি পূর্ণ বৃত্ত বা চক্কর গঠন করে। তাই অভ্যন্তরীণ প্রতিটি বিন্দুর জন্য পুরো এক একক ক্ষেত্রফল যোগ হয়, যা সূত্রে সরাসরি I হিসেবে বসে।
অপরদিকে, সীমানার বিন্দুগুলো পুরোপুরি ভেতরে থাকে না। কোনো সরল রেখা যখন একটি গ্রাফ বিন্দুর ওপর দিয়ে যায়, তখন তার চারপাশের জায়গার প্রায় অর্ধেক ভেতরে পড়ে এবং বাকি অর্ধেক বাইরে থাকে। ফলে সীমানার প্রতিটি বিন্দু অর্ধেক করে স্থান দখল করে। এজন্য B-কে দুই দিয়ে ভাগ করা হয়।
শেষের −1 অংশটি বহুভুজের সব কোণ ও সীমানার হিসাব সঠিকভাবে মিলিয়ে দেয়। বড় বহুভুজটিকে ছোট ত্রিভুজে ভাগ করলে কোনো ফাঁকা জায়গা বাদ পড়ে না, আবার কোনো অংশ দুবার গণনাও হয় না। প্রতিটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করে সবগুলো যোগ করলে বড় চিত্রটির নিখুঁত ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়।
তবে এই সূত্র সব ধরনের চিত্রে প্রযোজ্য নয়। বহুভুজটি অবশ্যই সরল হতে হবে। অর্থাৎ এর রেখাগুলো নিজেদের আড়াআড়ি ছেদ করবে না, সীমানা বন্ধ থাকবে এবং প্রতিটি কোণ গ্রাফের বিন্দুর ওপর অবস্থিত হতে হবে। সাধারণ সূত্রে ভেতরে কোনো ছিদ্র বা ফাঁপা স্থান থাকতে পারবে না।
যদি ভেতরে ডোনাটের মতো কোনো ছিদ্র থাকে, তাহলে প্রতিটি ছিদ্র একটি অতিরিক্ত সীমানা তৈরি করে। ছিদ্রের সংখ্যা H হলে সূত্রটি সামান্য পরিবর্তিত হয়: A = I + B/2 + H − 1। এখানে B গণনার সময় বাইরের সীমানা ও ছিদ্রের সীমানায় থাকা সব গ্রাফ বিন্দুকে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। যেমন I = 2, B = 12 এবং H = 1 হলে ক্ষেত্রফল দাঁড়ায় A = 2 + 6 + 1 − 1 = 8 বর্গ একক।
সূত্র ব্যবহারের আগে গণিত ভাইয়া সতর্ক করেন — কোনো রেখার ওপর দুই কোণের মাঝখানে অতিরিক্ত গ্রাফ বিন্দু থাকলে সেগুলোও B-এর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু কোণাগুলো গুনলে হবে না। আবার সীমানার বিন্দুকে ভুল করে ভেতরের বিন্দু হিসেবে গণনা করা যাবে না।
প্রয়োগের পূর্বে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি: চিত্রটি বন্ধ কি না, রেখাগুলো পরস্পরকে ছেদ করেছে কি না, সব কোণ গ্রাফের বিন্দুর ওপর আছে কি না এবং ভেতরে কোনো ছিদ্র আছে কি না। প্রথম তিনটি শর্ত ঠিক থাকলে মূল সূত্রটি চলবে; ছিদ্র থাকলে H যোগ করতে হবে।
রাতুল নিজের স্কুলের বহুভুজের জন্য এই নিয়মগুলো যাচাই করে। সে দেখে, তার চিত্রে কোনো ছিদ্র নেই, রেখাগুলো পরস্পরকে ছেদ করেনি এবং সব কোণ গ্রাফের বিন্দুতে অবস্থিত — অর্থাৎ এটি একটি সরল বহুভুজ। প্রথমে সীমানা ধরে একদিকে এগিয়ে প্রতিটি গ্রাফ বিন্দু চিহ্নিত করে, যাতে কোনো বিন্দু বাদ না যায় বা দুবার গণনা না হয়। এরপর ভেতরের বিন্দুগুলো সারি ধরে গোনে। কিছুক্ষণ পর সে চিৎকার করে ওঠে: সীমানায় বিন্দু আছে ৯৬টি (মূল বিন্দু বাদে), তাই B = 96। একদম ভেতরে বা কেন্দ্রে বিন্দু আছে একটি, তাই I = 1।
সূত্রে মান বসিয়ে সে লেখে: A = 1 + 96/2 − 1 = 1 + 48 − 1 = 48। অর্থাৎ বহুভুজের ক্ষেত্রফল ৪৮ বর্গ একক! স্কেল-কম্পাস ছাড়াই এত বড় একটি বহুভুজের নিখুঁত ক্ষেত্রফল মাত্র কয়েক মিনিটে বের হয়ে যায়।
গণিত ভাইয়া রাতুলের পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘পিকের সূত্র আমাদের দেখায় যে জ্যামিতিতে কখনো আকৃতির জটিলতার চেয়ে সঠিকভাবে তথ্য গোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও উৎসাহ দেন, গ্রাফ পেপারে নিজের মতো সরল বহুভুজ আঁকতে, I ও B গুনে সূত্রে বসাতে এবং পরিচিত জ্যামিতিক পদ্ধতিতে উত্তর মিলিয়ে দেখতে। এভাবেই বিন্দু গণনা এক চমৎকার ক্ষেত্রফলের ম্যাজিকে পরিণত হয়। সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।




