তিন দশক আগে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংবিধানে যুক্ত করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আবারও বহাল হয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে। ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরে ২০১১ সালে আপিল বিভাগ তা বাতিল করে দিলেও গত বছরের ২০ নভেম্বর দেওয়া এক রায়ে আগের সেই বাতিলের রায় বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ওই রায়ের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পাঁচটি ধারা বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ও বহাল রাখে আপিল বিভাগ, যার ফলে আইনগতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরার পথ তৈরি হয়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরো ব্যবস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আনা ৫৪টি পরিবর্তনের মধ্যে পাঁচটি ধারা বাতিল হলেও বাকি ৪৯টি ধারা এখনও কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি ধারার মাত্র দুটি—২০ ও ২১ ধারা—বাতিল হয়েছে। এই দুটি ধারা বাতিলের ফলে সংবিধানের ৫৮(ক) অনুচ্ছেদ ও দ্বিতীয় (ক) পরিচ্ছেদ পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, উপদেষ্টা নিয়োগ ও তাদের কার্যাবলি—এসব মূল বিধান ফিরলেও বাকি ছয়টি ধারা এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশিত হয়নি বলে আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে সংসদ ভাঙার নব্বই দিন আগে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই বিধান তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থায় সংসদ ভাঙার পরই কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সম্ভব। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণের ফরম, তাদের সংজ্ঞা ও পারিশ্রমিক-সংক্রান্ত সাংবিধানিক সুরক্ষার বিধানগুলো এখনও ফেরেনি। পঞ্চদশ সংশোধনীর ৪৯, ৫১ ও ৫৩ ধারা বাতিল না হওয়ায় সেগুলো যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিদের প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হওয়ার পথও এখন বন্ধ। ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৯৯ অনুচ্ছেদে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের জন্য প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা পদ গ্রহণের সুযোগ ছিল যা পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাদ দেওয়া হয়। ওই বিধানটি বর্তমানে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিচার বিভাগের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা এই পদে আসীন হতে পারবেন না। আইনজীবীদের মতে, পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত যদি এ বিষয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ না দেন, তাহলে সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করে এসব বিধান পুনর্বহাল করতে হবে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে শপথ ফরম, প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের সংজ্ঞা এবং পারিশ্রমিক বাবদ সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণের মতো বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রেখেই রায় দেওয়া হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেছেন।



