ঝালকাঠি জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং স্থানীয় দুইজন সংসদ সদস্যের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের কারণে জেলার চারটি উপজেলায় ৪১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঝুলে গেছে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘পরামর্শ না নেওয়ায়’ আপত্তি তুলে দুই সংসদ সদস্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রদান করেছেন। এর ফলে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা বরাদ্দের এসব প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
মন্ত্রণালয় জেলা পরিষদকে এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণের জন্য চিঠি দিলেও প্রশাসনিক অনুমোদন এখনো আটকে আছে। দুই সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প তালিকা নির্ধারণের আগে তাদের সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা বা সমন্বয় করা হয়নি। এই অভিমত লিখিতভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হয়েছে। অপরদিকে জেলা পরিষদ প্রশাসকের দাবি হলো, সংসদ সদস্যদের প্রেরিত কিছু প্রকল্পও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিএনপির দলীয় সূত্র থেকে ইঙ্গিত মেলে, স্থানীয় রাজনীতির আধিপত্যকে কেন্দ্র করেই সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল ও ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর সঙ্গে জেলা পরিষদ প্রশাসক শাহাদাৎ হোসেনের পূর্ব থেকেই মতানৈক্য চলছে। এই বিবাদের প্রভাবই প্রকল্পগুলোকে আটকে দিয়েছে। গত ৭ জুলাই মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানোর পরও এখন পর্যন্ত দুই সংসদ সদস্যের ‘পরামর্শ গ্রহণ’-এর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, জেলা পরিষদ সূত্রের বরাত দিয়ে এমনটাই জানা গেছে।
জেলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘সাধারণ বরাদ্দ’ খাত থেকে পরিষদের জন্য মোট ৭ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি বছরের মে মাসে এই অর্থের বিপরীতে ৪১৭টি প্রকল্পের একটি তালিকা প্রশাসনিক অনুমোদনের আবেদন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। তালিকাটি অনুযায়ী, ঝালকাঠি সদরে ১৭৫টি, নলছিটিতে ১৭৩টি, রাজাপুরে ৪৩টি এবং কাঠালিয়ায় ২৫টি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলোর ভিতর উল্লেখযোগ্য কাজ হল মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়ন, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আসবাবপত্র কেনা, ছোট রাস্তা নির্মাণ এবং নলকূপ স্থাপন।
তালিকা পাঠানোর অল্প সময়ের মধ্যেই এমপি ও প্রশাসকের দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ২৮ জুন ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম জামাল ও ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো একটি ডিও লেটার মারফত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানান। মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন যে, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের কোনোপরামর্শ নেওয়া হয়নি। তারা অনুরোধ করেন, এই সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত জেলা পরিষদের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হোক।
সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামালের মন্তব্য, ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত এমপিরা জেলা পরিষদের উপদেষ্টা। তাদের সাথে আলোচনা করে প্রকল্প গ্রহণ করা বিধান থাকলেও প্রশাসক তা মানছেন না, তাই মন্ত্রণালয়ে জানানো জরুরি ছিল।’
পরবর্তীতে ৭ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব খোন্দকার ফরহাদ আহমদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে জেলা পরিষদ প্রশাসককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, ‘জেলা পরিষদ আইন, ২০০০’-এর ধারা ৩০ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা পরিষদের উপদেষ্টা এবং তারা পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এছাড়াও এডিপি পরিপত্র-২০২২ অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এমপিদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই বিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে বোঝা যায়, জেলায় দলের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছেন সংরক্ষিত আসনের এমপি ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সহসভাপতি জীবা আমিনা খানের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত প্রশাসক শাহাদাৎ হোসেন। অপরপক্ষে রয়েছেন কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম জামাল এবং ঝালকাঠি-২ আসনের এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। আগের নির্বাচনে ঝালকাঠি-২ আসনের জন্য দলীয় টিকেট প্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব শাহাদাৎ হোসেন, কিন্তু মনোনয়ন পান ইলেন ভুট্টো। চলতি বছরের ১৫ মার্চ শাহাদাৎ হোসেন প্রশাসক নিযুক্ত হন, এবং তারপর থেকেই প্রকল্প বাছাই নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয়।
ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর অভিযোগ, তার নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলার জন্য প্রেরিত উন্নয়ন প্রস্তাবনাগুলো বাতিল করে নিজের ইচ্ছামতো প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে।
কিন্ত প্রশাসক শাহাদাৎ হোসেন ব্যাখ্যা দেন, ইলেন ভুট্টোর পাঠানো নলছিটি পৌরসভা কেন্দ্রিক দুটি প্রকল্প জেলা পরিষদের আওতায় বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। তাদের কিছু প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এরপরেও তারা কেন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন, তা তারাই বলতে পারবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া কোন প্রকল্পের দরপত্র আহবান বা বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব নয়। জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান শাহরিয়ারের ভাষ্য, প্রশাসক ও দুই সংসদ সদস্যের সমন্বয় ও উদ্যোগের ওপর প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সমঝোতা ব্যর্থ হলে বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাবে কিনা, সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।




