ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাদের ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে নতুন নজির স্থাপন করল সরকার। গত বৃহস্পতিবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়, যা এক বছরের জন্য বৈধ থাকবে। নিয়োগপ্রাপ্তরা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার গ্রেড-২ পদে দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে একসঙ্গে এত সংখ্যক রাজনীতিককে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে দেখা যায়নি। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর পল্লী উন্নয়ন বোর্ডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রাজনীতিকদের বসানো হলেও পরবর্তী সময়ে তা সীমিত পরিসরেই ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়োগের পেছনে তিনটি কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, বিগত সরকারের সময় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের মূল্যায়ন; দ্বিতীয়ত, বর্তমান আমলাদের মধ্যে বিশ্বস্ত লোকের অভাব; তৃতীয়ত, আমলা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক নেতা শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাননি বা দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাদের এখন এই নিয়োগের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কে কোন পদে নিয়োগ পেয়েছেন, তা নিম্নরূপ: বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেনকে। বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হয়েছেন সালাহ্উদ্দিন সরকার, যিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হয়েছেন যুবদলের সাবেক সহসভাপতি কামরুজ্জামান। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান হয়েছেন বেনজীর আহমেদ, যিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম, যিনি আগে সেখান থেকে অবসরে গিয়েছিলেন।

নিয়োগপ্রাপ্তরা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বিসিকের চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ জানান, বিসিক আইন ২০১৩-এর ১২(২) ধারা অনুযায়ী তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'বিসিক অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও খুব একটা এগোতে পারেনি। এখন সরকার চাইছে, বিসিক কার্যকর হোক।' বিসিসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম বলেন, 'আমলারা ঝুঁকি নিতে চান না, সাহস পান না। এই রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানকে আমি একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।'

তবে এই নিয়োগ ভালো চোখে দেখছেন না প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও তদবির বেড়ে যাবে। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, 'মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল একসময় রাজশাহী সিটির মেয়র ছিলেন। তখন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা না পেলেও পরবর্তী সময়ে ওই পদ প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য করা হয়। এখন তিনি অতিরিক্ত সচিব পদের মর্যাদা পেয়েছেন।' কর্মকর্তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে? সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন আটকে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, আইনগত বাধা না থাকায় এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, 'এখন দেখা যাবে, আমলারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো চালান, নাকি রাজনীতিবিদেরা। সরকার মূল্যায়ন করতে পারবে।' সাবেক একজন অর্থসচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, 'খাতভিত্তিক জ্ঞান না থাকার পরও রাজনীতিবিদদের নিয়োগের কারণ সরকারই ভালো জানে। তবে আগে অতিরিক্ত সচিবদের নিয়োগেও দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনা করা হতো না।'

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনে শীর্ষ পদে নিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রাখা হয়েছে। বিসিক আইনে নৈতিক স্খলন, দেউলিয়া বা চাকরিচ্যুত ব্যক্তি বাদে যে কাউকে চেয়ারম্যান নিয়োগের বিধান রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড, তাঁত বোর্ডসহ অন্যান্য সংস্থার আইনেও একই সুযোগ আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তি নিয়োগ দিয়ে কতটা সুফল আসবে? অথচ যোগ্যতার শর্ত আইনে রাখা হয়নি।