গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর অবস্থান করা ‘সম্রাট’ ও ‘নিহারকলি’ নামের দুটি হাতি সম্প্রতি তাদের আগের দেখভালকারীদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বন বিভাগ। উল্লেখ্য, বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে নির্যাতনের শিকার এবং চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগে হাতি দুটিকে উদ্ধার করে সাফারি পার্কে আনা হয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পোলসার গ্রামে ‘সম্রাট’ নামের হাতিটির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে নজরুল ইসলাম নামে এক মাহুতের মৃত্যু ঘটে। জানা যায়, কুড়িগ্রামের নজরুল ইসলাম ও পটুয়াখালীর হাসান নামক দুই ব্যক্তি এই হাতিটি হাতি ব্যবহার করে স্থানীয় বিভিন্ন গ্রাম থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন। এই ঘটনার পর বন বিভাগ হাতিটিকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং পরবর্তীতে পুনর্বাসনের জন্য গাজীপুর সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়। অন্যদিকে, একই বছরের ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে ‘নিহারকলি’ নামের অন্য হাতিটি উদ্ধার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, লালন-পালনকারীর লোকজন হাতিটিকে বেঁধে নির্যাতন করছে এবং রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলা হচ্ছে। উদ্ধার পরবর্তী সময়ে এটিকেও গাজীপুর সাফারি পার্কে নিয়ে আসা হয়।
সম্প্রতি সাফারি পার্কে পরপর দুটি হাতির মৃত্যুর পর সেখানে মোট হাতির সংখ্যা কমে আটটিতে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতেই সম্রাট ও নিহারকলিকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাতি দুটি ফেরত পেতে লালন-পালনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের বিভিন্ন স্তরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।
তবে বন বিভাগের এই পদক্ষেপ নিয়ে পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বন্য প্রাণীবিষয়ক সংগঠন ‘পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর চেয়ারম্যান রাকিবুল হক গত ১৯ আগস্ট প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে হাতি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং শর্তাবলী সম্পর্কে ১৪টি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন।
বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল ঢাকার বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী দাবি করেছেন, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই এই হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি জানান, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে যে, হাতিগুলো যেন আর কোনো নির্যাতনের শিকার না হয়, কষ্ট না পায় এবং চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত না হয়।
বন বিভাগের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন্য প্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আলী রেজা খান। তিনি এই পদক্ষেপকে ‘গুরুতর অন্যায়’ হিসেবে অভিহিত করে প্রশ্ন তোলেন, যারা নিজেদের অধীনে থাকা হাতির যত্ন নিতে ব্যর্থ, তারা বনের বন্যপ্রাণীদের কীভাবে রক্ষা করবে। এছাড়া তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আর্থিক লাভের চিন্তা থেকে মালিকরা আবারও এই হাতিগুলোকে মালসামান টানা বা চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহার করতে পারে, যা বন্যপ্রাণী সুরক্ষার পরিপন্থী।




